ইরানের বিরুদ্ধে দখলদার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে, যার বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে পাকিস্তানে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে দেশটিতে হঠাৎ করেই জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে জনগণের ভোগান্তি কমাতে রাজধানী ইসলামাবাদে সাময়িকভাবে সব গণপরিবহনের ভাড়া ফ্রি ঘোষণা করেছে পাকিস্তান সরকার। আগামী ৩০ দিনের জন্য এই সুবিধা চালু থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
শুক্রবার দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকবি মাইক্রো ব্লগিং সাইট এক্সে এক বার্তায় জানান, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ-এর নির্দেশনায় ইসলামাবাদের সব গণপরিবহনের ভাড়া ৩০ দিনের জন্য সম্পূর্ণ ফ্রি রাখা হবে। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত শনিবার থেকে কার্যকর হবে এবং এ জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন রুপি ব্যয় বহন করবে।
সরকারের এই পদক্ষেপকে সাধারণ মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ার আশঙ্কা ছিল, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারত। ভাড়া ফ্রি রাখার ফলে অন্তত সাময়িকভাবে সেই চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির বিষয়টি দেশটির অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাতে পাকিস্তানের জ্বালানিমন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক নতুন দামের ঘোষণা দেন। এতে দেখা যায়, পেট্রোলের দাম প্রায় ৪৩ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম প্রায় ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
নতুন ঘোষণায় প্রতিলিটার পেট্রোলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৫৮ দশমিক ৪০ রুপি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে ডিজেলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি লিটার ৫২০ দশমিক ৩৫ রুপি। ডিজেল মূলত পরিবহন ও কৃষি খাতে বেশি ব্যবহৃত হওয়ায় এর মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি জীবনযাত্রার ব্যয়ে প্রভাব ফেলতে পারে।
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে আগের দামে জ্বালানি ধরে রাখতে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ইরানে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনাও কম। এই প্রেক্ষাপটে সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি শুধু পরিবহন খাতেই নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়লে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামও বেড়ে যেতে পারে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে গণপরিবহন ভাড়া ফ্রি রাখার সিদ্ধান্তকে একটি ভারসাম্য রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি একদিকে যেমন জনগণের ওপর চাপ কমাবে, অন্যদিকে সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপও সৃষ্টি করবে।
সব মিলিয়ে পাকিস্তান বর্তমানে একটি কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বৈশ্বিক সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে। সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে, তবে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে তা এখনো অনিশ্চিত।