হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া চা বাগানে পালিত হয়েছে তেলিয়াপাড়া দিবস। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়াই হচ্ছে স্বাধীনতার সুতিকাগার। এখান থেকেই স্বাধীনতার সূচনা হয়েছিল।”
শনিবার (৪ এপ্রিল) সকালে তেলিয়াপাড়া চা বাগানের বাংলো প্রাঙ্গনে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দিবসটি উপলক্ষে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়, যার মধ্যে ছিল শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন।
মির্জা ফখরুল তাঁর বক্তব্যে বলেন, ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল তেলিয়াপাড়ায় অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায়। তিনি দাবি করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর উদ্যোগে এবং সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানী-এর নেতৃত্বে এখানে সেক্টর কমান্ডারদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
তিনি আরও বলেন, এই বৈঠকের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের কৌশল নির্ধারণ করা হয় এবং দেশব্যাপী সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তেলিয়াপাড়ার এই বৈঠক মুক্তিযুদ্ধকে একটি সংগঠিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে মির্জা ফখরুল বলেন, “জিয়াউর রহমান যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তা ছিল পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ।” তিনি দাবি করেন, জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিকামী জনগণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
তবে তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। তাঁর মতে, “স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস হলো—একক নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হয়নি।” তিনি উল্লেখ করেন, সেই সময় জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন এবং মাঠপর্যায়ে নেতৃত্বে ছিলেন অন্যান্য নেতারা।
মির্জা ফখরুলের এসব বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক মহলে ভিন্নমত রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সূচনা, নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গবেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমদ আযম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, জাতীয় সংসদের হুইপ আলহাজ্ব জি কে গউছ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামসহ আরও অনেকে। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বক্তারা বলেন, তেলিয়াপাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানে অনুষ্ঠিত বৈঠক মুক্তিযুদ্ধের কৌশল নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে, যা দেশের স্বাধীনতার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত।
এছাড়া বক্তারা তেলিয়াপাড়াকে জাতীয় পর্যায়ে আরও সংরক্ষণ ও উন্নয়নের দাবি জানান। তারা বলেন, এই ঐতিহাসিক স্থানকে সংরক্ষণ করে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা জরুরি।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং সাধারণ জনগণ উপস্থিত ছিলেন। দিনব্যাপী কর্মসূচির মাধ্যমে তেলিয়াপাড়ার ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরা হয় এবং শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
সব মিলিয়ে, তেলিয়াপাড়া দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পুনরালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে ওঠে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের আয়োজন নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।