আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার চূড়ান্ত আল্টিমেটামকে কার্যত উপেক্ষা করেছে ইরান। ওয়াশিংটনের কঠোর হুমকি ও সামরিক চাপকে তোয়াক্কা না করে উল্টো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে শক্তি প্রদর্শন করেছে তেহরান। সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই মার্কিন মিত্র দেশ কুয়েত ও ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা আরও বেড়ে গেছে।
ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড ট্রাম্পের দেওয়া হুমকিকে ‘অসহায়, নার্ভাস ও বোকামিপূর্ণ’ মন্তব্য করে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলেছে, ইরান কোনো ধরনের চাপ বা হুমকিতে নতি স্বীকার করবে না। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ তথ্য জানিয়েছে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরান যদি নির্ধারিত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোনো সমঝোতায় না আসে অথবা অবরুদ্ধ করে রাখা হরমুজ প্রণালী খুলে না দেয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ‘সবচেয়ে ভয়াবহ ও চূড়ান্ত সামরিক হামলা’ চালানো হবে।
তবে সেই আল্টিমেটামকে গুরুত্ব না দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার বার্তা দিয়েছে তেহরান। এরই অংশ হিসেবে কুয়েতে ব্যাপক ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার। কুয়েতের সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ইরানের ড্রোন হামলায় দেশটির দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সমুদ্রের পানি লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার ফলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
কুয়েতের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানের একটি শক্তিশালী ড্রোন সরাসরি দেশটির সরকারি মন্ত্রণালয়ের অফিস কমপ্লেক্সে আঘাত হেনেছে। এছাড়া শুওয়াইক তেল খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়ও আগুন ধরে যায়। হামলার পর ওই এলাকায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনায় ড্রোন হামলার ঘটনা বাড়ছে। বিশেষ করে কুয়েত সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানের জবাব হিসেবেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে।
এর আগে চলতি মাসের শুরুতে কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাংকেও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। সেই হামলার পর থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
এদিকে কুয়েতের পাশাপাশি একই সময়ে ইসরায়েলের আকাশেও হামলার সতর্ক সংকেত বেজে ওঠে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে, ইরান থেকে ছোড়া একাধিক শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ধেয়ে এসেছে।
পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, “সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে যদি হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ মুক্ত না করা হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে।”
এর আগে গত ২৭ মার্চ ট্রাম্প ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় মার্কিন হামলা সাময়িকভাবে ১০ দিনের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা আগামীকাল সোমবার, ৬ এপ্রিল।
উল্লেখ্য, প্রায় এক মাসের বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় বিমান হামলা চালাচ্ছে। এসব হামলার প্রথম দফাতেই ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ সহস্রাধিক মানুষ নিহত হন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
খামেনির মৃত্যুর পর ইরানে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয় এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়। তবে সেই পরিস্থিতিতেও তেহরান তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক চাপের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে যাচ্ছে দেশটি।
আকাশজমিন / আরআর