আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার আধিপত্যবাদী লড়াইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট না হয়ে বিশ্বমঞ্চে ‘মধ্যম শক্তির’ দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “বিশ্বব্যবস্থাকে কেবল দুটি দেশের ওপর নির্ভরশীল রাখা যাবে না; বরং ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে একটি স্বতন্ত্র মেরু গঠন করা জরুরি।”
ম্যাক্রোঁ এশিয়ায় সপ্তাহব্যাপী সফরের শেষ দিনে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে স্পষ্ট করে বলেন, ফ্রান্স বা ইউরোপ কোনো পরাশক্তির ‘অনুগত রাষ্ট্র’ হতে চায় না। তিনি উল্লেখ করেন, “আমাদের লক্ষ্য হলো চীনের আধিপত্য কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের খামখেয়ালিপনার শিকার না হওয়া।”
বর্তমানে ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো দেশগুলো তীব্র জ্বালানি সংকটে ভুগছে। এই পরিস্থিতিতে ম্যাক্রোঁ মনে করেন, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা এবং ভারতের মতো দেশগুলোর সঙ্গে মিলিত হয়ে একটি শক্তিশালী জোট গঠন করা সম্ভব। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা, পারমাণবিক শক্তি এবং প্রতিরক্ষা খাতে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন ভারসাম্য তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ম্যাক্রোঁর দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে। ইরান ইস্যুতে ফ্রান্স সাহায্য করছে না বলে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফরাসি প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে ফরাসি আকাশসীমা ব্যবহারে অনুমতি না দেওয়ায় তিনি ফ্রান্সকে ‘অত্যন্ত অসহযোগী’ রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এর জবাবে ম্যাক্রোঁ বলেছেন, ইরান ইস্যুতে কোনো আলোচনা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পথে হেঁটেছে, যা ‘প্যান্ডোরার বক্স’ খুলে দেওয়ার শামিল। তিনি ইরাক, সিরিয়া ও আফগানিস্তানের উদাহরণ টেনে উল্লেখ করেছেন, কেবল বোমা মেরে বা সামরিক অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না। বরং তিনি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি ‘ডি-কনফ্লিকশন মেকানিজম’ বা সংঘাত নিরসন ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ম্যাক্রোঁ মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফরাসি নেতা চার্লস দ্য গোল-এর আদর্শ অনুসরণ করছেন। দ্য গোল যেভাবে স্নায়ুযুদ্ধের সময় ওয়াশিংটন ও মস্কোর বাইরে ফ্রান্সের স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখতে চেয়েছিলেন, বর্তমান সময়ে ম্যাক্রোঁ বেইজিং ও ওয়াশিংটনের ক্ষেত্রে একই নীতি গ্রহণ করছেন।
আগামী জুনে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিতব্য জি-৭ সম্মেলনে ম্যাক্রোঁ তার ‘তৃতীয় শক্তির’ পরিকল্পনা বিশ্বনেতাদের সামনে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি বিশ্বমঞ্চে মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমে বৈশ্বিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করছেন।
মোটকথা, ম্যাক্রোঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, ফ্রান্স এবং ইউরোপ কোনো একক শক্তির প্রভাবশালী নীতির অধীনে চলতে চায় না। বর্তমান আন্তর্জাতিক উত্তেজনার মধ্যেই তিনি শান্তিপূর্ণ ও যৌক্তিক সমাধানের পথ খুঁজে বিশ্বমঞ্চে মধ্যম শক্তির দেশগুলোর অবস্থান দৃঢ় করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
আকাশজমিন / আরআর