আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন করে কড়া অবস্থান নিয়েছে ইরান। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী জানিয়েছে, এই প্রণালি আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরবে না—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য এটি চিরতরে বদলে গেছে।
আইআরজিসির নৌবাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা এক বিবৃতিতে এই ঘোষণা দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, পারস্য উপসাগর অঞ্চলের জন্য ইরান যে ‘নতুন ব্যবস্থা’ চালু করার পরিকল্পনা করছে, তা বাস্তবায়নের জন্য তারা সামরিক প্রস্তুতির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি পরিবহন করা হয়। ফলে এই জলপথে যেকোনো ধরনের উত্তেজনা বা বিধিনিষেধ আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের পার্লামেন্টারি কমিটিতে সম্প্রতি একটি খসড়া আইন অনুমোদন করা হয়েছে, যেখানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ট্রানজিট ফি বা যাতায়াত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, এই শুল্ক ইরানের জাতীয় মুদ্রায় পরিশোধ করতে হবে।
ইরানি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত আইনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জাহাজ চলাচলের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে যেসব দেশ ইরানের ওপর একতরফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও বিধিনিষেধ আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব জোরদার করা, সশস্ত্র বাহিনীর কর্তৃত্ব বৃদ্ধি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশগত বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ওমানের সঙ্গে আইনি সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা দিন দিন বাড়ছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ইরানকে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং এজন্য সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন।
ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ইরান যদি প্রণালি খুলে না দেয়, তাহলে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হতে পারে। এমনকি তিনি বলেছেন, ইরান ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোনো চুক্তিতে রাজি না হলে দেশটিকে ‘সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়া’ হতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্থানীয় সময় রোববার ট্রাম্প এই হুমকি দেন। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ইরানের জন্য নতুন সময়সীমাও নির্ধারণ করেন।
সেই পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, “মঙ্গলবার, পূর্ব উপকূলীয় সময় রাত ৮টা।” তেহরানের সময় অনুযায়ী যা বুধবার মধ্যরাত। এর আগে একই দিন ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তার দেওয়া সময়সীমার মধ্যে ইরান কোনো পদক্ষেপ না নিলে দেশটির কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বা সেতু অক্ষত থাকবে না।
এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ট্রাম্পের এই আলটিমেটাম নিয়ে রাশিয়া ও চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই বিরোধ যদি আরও তীব্র হয়, তাহলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা, এবিসি নিউজ