ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কৌশলগত ও সামরিক স্থাপনায় এই হামলা পরিচালিত হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় সামরিক অভিযানের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই অভিযানের পর থেকেই অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং ইরানও পাল্টা হামলা শুরু করে। ফলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পূর্ণমাত্রার সংঘাতে রূপ নেয়। ইতোমধ্যে পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এই সংঘাত অব্যাহত রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযানের সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। সেন্টকম জানিয়েছে, এই অভিযানের আওতায় এখন পর্যন্ত ইরানের ১৫৫টির বেশি নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোকেও লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
সেন্টকমের দাবি অনুযায়ী, হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল ইরানের ইসলামি বিপ্লবী বাহিনী (আইআরজিসি)-এর সদর দপ্তর, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, নৌবাহিনীর জাহাজ এবং সাবমেরিন। এসব স্থাপনাকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয় এবং এগুলোর ওপর হামলার মাধ্যমে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় পরিসরে হামলা পরিচালনা করা শুধু সামরিক শক্তি প্রদর্শনের বিষয় নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত কৌশলের অংশ। এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া এবং তাদের যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা করা হয়। তবে এর ফলে সাধারণ মানুষের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইরানে ৩ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ১ হাজার ৬৬৫ জনই বেসামরিক নাগরিক। এই তথ্য মানবিক সংকটের গভীরতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যুদ্ধের সময়েও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যার মধ্যে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা করা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই নিয়ম লঙ্ঘিত হলে তা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই চলমান সংঘাত ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, কারণ ইরান অঞ্চলটি বিশ্ব তেল সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে এখানে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এ ছাড়া এই যুদ্ধ আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিভিন্ন দেশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালালেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধানের পথ দেখা যাচ্ছে না। বরং প্রতিদিনই নতুন করে উত্তেজনা বাড়ছে এবং সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো সংঘাতের বিস্তার। যদি যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে তা শুধুমাত্র ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে করে বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও গুরুতরভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সংঘাত বন্ধ করা এবং একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া। তবে বর্তমান বাস্তবতায় সেই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, উভয় পক্ষই এখনো কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং কেউই সহজে ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যাপক সামরিক অভিযান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে বাড়ছে সামরিক চাপ, অন্যদিকে গভীর হচ্ছে মানবিক সংকট। এখন দেখার বিষয়, এই সংঘাত কতদূর গড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত এর পরিণতি কী হয়।
তথ্যসূত্র: বিবিসি