হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অবরোধের হুমকি ভারতের জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে যেকোনো বিঘ্ন ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। বিশ্বব্যাপী তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে এই প্রণালির ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে তেহরান, ফলে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
যদিও ইরান নিজেদের জাহাজ চলাচল অব্যাহত রেখেছে এবং কিছু দেশকে সীমিতভাবে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে, তবুও পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। যুদ্ধ শেষে টোল ব্যবস্থা চালুর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে, যা ভবিষ্যতে জ্বালানি পরিবহন ব্যয় আরও বাড়াতে পারে।
এর মধ্যে গত শনিবার পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত যুদ্ধবিরতি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর মার্কিন সামরিক বাহিনী ঘোষণা দিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ ও বের হওয়া সব ধরনের নৌ-চলাচলের ওপর অবরোধ আরোপ করতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এর এই অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন হুমকির জবাবে ইরান পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের বন্দরগুলো নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে। এতে পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে ভারত। প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় সামান্য বিঘ্নও বড় ধরনের জ্বালানি সংকট ডেকে আনতে পারে, যা দেশের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিকে ধাক্কা দিতে পারে।
ইরানের নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও ভারত কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিল, কারণ তাদের কয়েকটি জাহাজকে ‘সেফ প্যাসেজ’ বা নিরাপদ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি ভারতের পতাকাবাহী একটি এলপিজি জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যার ফলে মোট সফল পারাপারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯টিতে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি অবরোধ কার্যকর করে, তাহলে এই সীমিত সুবিধাটুকুও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে ভারতের জ্বালানি সরবরাহ আরও সংকুচিত হবে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে চাপ বাড়বে।
ইতোমধ্যে গ্যাসের ঘাটতির কারণে নয়াদিল্লি শিল্প খাতের পরিবর্তে সাধারণ পরিবারকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে অনেক রেস্তোরাঁ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও মুনাফা কমে গেছে।
জ্বালানির দাম বাড়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। মুম্বাই ও দিল্লির মতো বড় শহরে অনেক অভিবাসী শ্রমিক খরচ সামলাতে না পেরে নিজ গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি তাদের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে ভারত সরকার হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য কোনো ধরনের অর্থ প্রদান করার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অবরোধ নয়াদিল্লি ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বর্তমানে পারস্য উপসাগরে ভারতের এক ডজনেরও বেশি জাহাজ আটকে আছে। মার্কিন অবরোধ কার্যকর হলে এসব জাহাজ মাঝসমুদ্রে আটকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ভারতকে এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের আরও গভীরে টেনে নিতে পারে।
সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও গভীরভাবে পড়বে।