আন্তর্জাতিক ডেস্ক
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ইউরোপীয় দেশগুলো একটি নতুন যুদ্ধোত্তর নিরাপত্তা জোট গঠনের পরিকল্পনা করছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের পর সম্ভাব্য যুদ্ধ শেষে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে তৈরি হওয়া এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধ শেষে একটি আন্তর্জাতিক জোটের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে বোমা অপসারণ, মাইন পরিষ্কার এবং নিয়মিত সামরিক নজরদারির ব্যবস্থা করা। তবে পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এতে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত না করার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানিয়েছেন, এই আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা মিশনে কোনো যুদ্ধরত পক্ষকে রাখা হবে না। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা ইরান—কাউকেই সরাসরি এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। ইউরোপীয় কূটনীতিকদের মতে, এই মিশনে অংশ নেওয়া ইউরোপীয় নৌবাহিনী মার্কিন সামরিক কমান্ডের অধীনে পরিচালিত হবে না, বরং একটি স্বতন্ত্র কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনা। ইউরোপীয় কর্মকর্তারা মনে করছেন, সংঘাত শেষ হলেও এই অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বজায় থাকতে পারে।
এই পরিকল্পনায় জার্মানির অংশগ্রহণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিদেশে সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে জার্মানির ওপর নানা রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও, এবার তারা এই মিশনে অংশ নিতে সম্মত হয়েছে।
আগামী শুক্রবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার একাধিক দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি অনলাইন বৈঠকের আয়োজন করবেন। সেখানে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। ব্রিটিশ ও ফরাসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তবে চীন ও ভারতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারোট বলেছেন, এই মিশন কেবল তখনই কার্যকরভাবে মোতায়েন করা হবে যখন অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সব ধরনের শত্রুতা বন্ধ হবে। তিনি আরও বলেন, পরিকল্পনাটি ইরান ও ওমানসহ প্রণালি সংলগ্ন দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, যা পরোক্ষভাবে ইরানের সম্মতির প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করে।
তবে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যেই এই পরিকল্পনা নিয়ে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। ফ্রান্সের অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি উপস্থিতি থাকলে ইরান এই উদ্যোগে অংশ নিতে অনাগ্রহ দেখাতে পারে। অন্যদিকে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দেওয়া হলে মার্কিন প্রশাসন, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, এ সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হতে পারেন।
ইউরোপীয় কূটনীতিকদের মতে, ট্রাম্পের শুল্ক নীতি, ইউক্রেন ইস্যুতে সহায়তা কমানো এবং বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক মন্তব্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা শীতল হয়েছে, যা এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রস্তাবিত এই ইউরোপীয় পরিকল্পনার তিনটি প্রধান ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপে বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া শত শত জাহাজকে নিরাপদে বের করে আনার জন্য লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া হবে। দ্বিতীয় ধাপে সমুদ্রতলে পুঁতে রাখা মাইন অপসারণ করা হবে, যাতে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিমুক্ত হয়। তৃতীয় ধাপে নিয়মিত সামরিক প্রহরা ও নজরদারির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
এই পুরো উদ্যোগটি ২০২৪ সালে লোহিত সাগরে পরিচালিত ‘অপারেশন অ্যাসপিডস’-এর আদলে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শেষ হলেও এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া কোনো একক শক্তির পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
তথ্যসূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল
আকাশজমিন / আরআর