ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান

ইরানের ১০০ বিলিয়ন ডলার জব্দ: কোথায় কত টাকা


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ সময় : ৩:৫৬ পিএম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জব্দ হয়ে থাকা ইরানের বিপুল অর্থসম্পদ আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও সরকারি সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আটকে থাকা ইরানের সম্পদের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এই অর্থ কোন কোন দেশে রয়েছে, কীভাবে জব্দ হলো এবং তা অবমুক্ত হলে ইরানের অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে—এসব বিষয় এখন ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।

ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘ প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে চাপের মুখে রয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকটের পর থেকেই ওয়াশিংটন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ শুরু করে। পরবর্তীতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে এসব নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হয়। এর ফলে তেল বিক্রির আয়সহ বহু বৈদেশিক সম্পদ বিদেশি ব্যাংকে আটকে পড়ে, যা ইরান দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করতে পারছে না।

সম্প্রতি যুদ্ধবিরতি আলোচনা শুরুর আগে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ দাবি করেন, যেকোনো আলোচনার আগে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ অবমুক্ত করতে হবে। এরপরই আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পায়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন জানায়, কোনো নতুন সিদ্ধান্ত হয়নি এবং সব সম্পদ এখনো জব্দ অবস্থায় রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে থাকা ইরানের মোট সম্পদের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে। মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের গবেষক ফ্রেডেরিক স্নাইডার বলেন, এই অর্থ ইরানের বার্ষিক জ্বালানি আয়ের প্রায় তিন গুণ। তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত বড় অঙ্কের অর্থ, বিশেষ করে এমন একটি দেশের জন্য যা দশকের পর দশক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে।”

ইরানের জব্দকৃত সম্পদ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। ইরানি গণমাধ্যম ও বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, চীনে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার, ভারতে ৭ বিলিয়ন ডলার, ইরাকে ৬ বিলিয়ন ডলার, কাতারে ৬ বিলিয়ন ডলার, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার, জাপানে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার আটকে আছে।

কাতারে থাকা অর্থ মূলত দক্ষিণ কোরিয়া থেকে স্থানান্তরিত তেলের আয় হিসেবে ধরা হয়, যা একসময় আংশিকভাবে ইরানের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হলেও পরে আবার জব্দ করা হয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার পর এই অর্থ ব্যবহারে বাধা সৃষ্টি হয়।

ইরানের সম্পদ জব্দের সূচনা হয় ১৯৭৯ সালে। সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ইরানকে “জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি” ঘোষণা করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। তৎকালীন সময়ে ইরানি ছাত্রদের মার্কিন দূতাবাস দখল ও ৬৬ জন মার্কিন নাগরিককে জিম্মি করার ঘটনা এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় ভূমিকা রাখে।

পরবর্তীতে ১৯৮১ সালে আলজিয়ার্স চুক্তির মাধ্যমে কিছু জিম্মি মুক্তি পায় এবং যুক্তরাষ্ট্র আংশিকভাবে ইরানের সম্পদ অবমুক্ত করে। তবে পারমাণবিক ইস্যু সামনে আসার পর দুই দেশের সম্পর্ক আবারও অবনতির দিকে যায়।

২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে ‘জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ চুক্তির মাধ্যমে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয় এবং ইরান আংশিকভাবে সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ পায়। কিন্তু ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সম্পদ আবারও আটকে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ১০০ বিলিয়ন ডলার ইরানের মোট জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ। যদি এই অর্থ অবমুক্ত হয়, তাহলে দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোকসানে ফারমানফারমাইয়ান বলেন, এই অর্থ দিয়ে ইরান তার ভাঙা অবকাঠামো—বিশেষ করে তেল ক্ষেত্র, পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা—আধুনিকায়ন করতে পারবে। একই সঙ্গে মুদ্রার অস্থিরতা কমানো এবং অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হবে।

তিনি আরও বলেন, “এই অর্থ ফিরিয়ে আনতে পারলে ইরান শুধু অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই নয়, রাজনৈতিক চাপও অনেকাংশে কমাতে পারবে।”

ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রিস ফেদারস্টোন মনে করেন, সম্পদ অবমুক্ত হলে তা কূটনৈতিক সম্পর্কেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কমার ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নত করতে সহায়ক হবে।

তবে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ জব্দের নীতিকে সমালোচকরা একপেশে বলে মনে করেন। তাদের মতে, ইরান, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, ভেনিজুয়েলা ও কিউবার মতো দেশগুলোর সম্পদ জব্দ করা হলেও অন্য অনেক দেশের ক্ষেত্রে একই নীতি প্রয়োগ করা হয় না।

তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত এবং কিছু ক্ষেত্রে নির্বাচিত দেশগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, রিয়ালের অবমূল্যায়ন এবং বেকারত্বের চাপে রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে একাধিক বিক্ষোভও হয়েছে, যা অর্থনৈতিক দুরবস্থার সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, ইরান এই অর্থ ব্যবহার করে বিদেশি ঋণ পরিশোধ, জ্বালানি খাত পুনর্গঠন এবং শিল্পখাতে বিনিয়োগ করতে চায়।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের জব্দকৃত ১০০ বিলিয়ন ডলার শুধু একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু। এই অর্থ অবমুক্ত হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের রাজনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে এই বিপুল অর্থের ভাগ্য।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা



এ সম্পর্কিত আরো খবর