আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ওয়াশিংটন পোস্টের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র এক ধরনের ‘সিসিফাসের ফাঁদে’ পড়েছে। কিন্তু এই পুরো ভূরাজনৈতিক খেলায় নেপথ্যে থেকে সবচেয়ে কৌশলী অবস্থান নিয়েছে চীন। দীর্ঘদিনের মিত্র ইরানকে ঘিরে বেইজিং প্রকাশ্যে নীরব থাকলেও আড়ালে তাদের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল অত্যন্ত সক্রিয়।
বিশ্লেষণে বলা হয়, মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর ঘটনায় চীন কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। এমনকি পরবর্তী নেতৃত্ব পরিবর্তন নিয়েও বেইজিং কেবল সীমিত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা বলেছে। এতে বোঝা যায়, চীন ইচ্ছাকৃতভাবে সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে কূটনৈতিক দূরত্ব বজায় রাখছে।
চীন নিজেকে একটি ‘শান্তি স্থাপনকারী শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। তবে একই সঙ্গে তারা এমন কোনো পরিস্থিতিতে জড়াতে চায় না যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি উত্তেজনা তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থান চীনের বহুমাত্রিক কূটনৈতিক কৌশলের অংশ, যেখানে তারা একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে চায়, অন্যদিকে নিজেদের বৈশ্বিক প্রভাবও ধরে রাখতে চায়।
অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা চীনের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে এবং দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে সরাসরি লাভবান হলেও দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা চীনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। চীন বিশ্বের বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ হওয়ায় এই অস্থিরতা তাদের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ-অবরোধের কড়া সমালোচনা করেছে চীন। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটিকে ‘বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করে বলেছে, এটি সংঘাত আরও বাড়াবে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহন ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।
চীনা রাষ্ট্রপতি সি চিনপিং স্পষ্টভাবে বলেছেন, বিশ্ব যেন আবার ‘জঙ্গলের আইন’-এ ফিরে না যায়। তার এই মন্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি পরোক্ষ কটাক্ষ হিসেবে দেখছেন, বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির প্রেক্ষাপটে।
চীন যদিও ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র, তবে তারা প্রকাশ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতে অনাগ্রহী। কারণ অতীত অভিজ্ঞতায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক জড়িত থাকার ঘটনাগুলো চীনের নীতিনির্ধারকদের সতর্ক করেছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, চীন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। তারা এই দেশগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল অংশীদার হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে ইরান ও ইসরায়েলকে তুলনামূলকভাবে ‘সংঘাতনির্ভর রাষ্ট্র’ হিসেবে বিবেচনা করছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে হরমুজ প্রণালি সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবে চীন ও রাশিয়ার ভেটো দেওয়াও তাদের কৌশলগত অবস্থানকে স্পষ্ট করে। চীনের মতে, সংকটের মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ, যা প্রস্তাবে যথাযথভাবে উল্লেখ ছিল না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন এখন ইরান ইস্যুকে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের বড় সংঘাতে পরিণত হতে দিতে চায় না। কারণ আগামী সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সি চিনপিংয়ের বৈঠককে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষণ বলছে, চীন প্রকাশ্যে নিরপেক্ষতা দেখালেও আড়ালে তারা কৌশলগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে, যা ভবিষ্যতের বৈশ্বিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
আকাশজমিন / আরআর