ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান

হরমুজ ঘিরে নতুন উত্তেজনা:


  • আপলোড সময় : রবিবার ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ সময় : ৬:৪১ পিএম

ইসলামাবাদে প্রথম দফার বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিতীয় দফা আলোচনা অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের বিভিন্ন মহলের একের পর এক অস্পষ্ট ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ফলে কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা যেমন কমে এসেছে, তেমনি আঞ্চলিক উত্তেজনাও নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে।

পরিস্থিতির টানাপোড়েনের মধ্যে ইরান আবারও হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটি ঘোষণা দিয়েছে, নির্ধারিত শর্ত পূরণ ছাড়া কোনো জাহাজ ওই জলপথ অতিক্রম করতে পারবে না। পাশাপাশি ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করার প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছে।

ঘটনার মোড় ঘুরতে শুরু করে গত শুক্রবার, যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার খোলার পরপরই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির একটি এক্স পোস্টকে কেন্দ্র করে। সেখানে তিনি জানান, লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কিছু শর্তসাপেক্ষ সুবিধা দেওয়া হবে। তিনি উল্লেখ করেন, নির্ধারিত রুট এবং ইরানের বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থার নির্দেশনা মেনে চললে জাহাজগুলো চলাচল করতে পারবে।

এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে প্রায় ১২ ডলার কমে যায়। পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ এই কূটনৈতিক সংকেতকে শান্তি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি হিসেবে স্বাগত জানায়। তখন পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী প্রতিনিধিরা তেহরানেই অবস্থান করছিলেন।

তবে খুব দ্রুতই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। আব্বাস আরাগচির ওই পোস্টকে অস্পষ্ট ও অসম্পূর্ণ বলে ইরানের অভ্যন্তরে সমালোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে ইরানের আইনপ্রণেতা ও কট্টরপন্থী মহল দাবি করে, এমন গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নয়, বরং আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় হওয়া উচিত ছিল। তাদের মতে, এই ধরনের পোস্ট ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ আরাগচির বক্তব্যকে “ভুল অথবা অসম্পূর্ণ” হিসেবে উল্লেখ করে জানায়, এতে জাহাজ চলাচলের শর্ত ও পদ্ধতি সম্পর্কে যথেষ্ট পরিষ্কার তথ্য ছিল না। ফলে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি দাবি করেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তরে সম্মত হয়েছে এবং এই সিদ্ধান্তের জন্য তিনি তেহরানকে ধন্যবাদ জানান। তবে ইরানের পক্ষ থেকে এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করা হয়।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং আলোচনাকারী দলের প্রধান মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্যে অনেক ভুল তথ্য রয়েছে। তিনি আরও জানান, ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের চূড়ান্ত আলোচনা হয়নি।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফা বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও ইরান সাফ জানিয়ে দেয়, তারা আলোচনায় বসতে রাজি নয়। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র “অযৌক্তিক” শর্ত ও দাবি সামনে এনেছে। এতে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে ইরানের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রভাব সবচেয়ে বেশি। আইআরজিসি মনে করে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির কিছু বক্তব্য অপ্রয়োজনীয় ছাড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছিল, যা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একের পর এক পোস্ট পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। ইরানের সংসদের স্পিকার এবং আলোচনাকারী দলের সদস্য মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এসব পোস্টকে বিভ্রান্তিকর বলে মন্তব্য করেন।

পরে ইরানের পক্ষ থেকে আরও স্পষ্ট করা হয় যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে কেবলমাত্র সেইসব জাহাজ চলাচল করতে পারবে, যেগুলো আইআরজিসি নৌবাহিনীর অনুমতি নেবে, নির্ধারিত রুট ব্যবহার করবে এবং নির্ধারিত টোল পরিশোধ করবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। কারণ ইরান এখনো মনে করে, হরমুজ প্রণালি তাদের কৌশলগত শক্তির জায়গা এবং এই জলপথ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা করতে সক্ষম।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাঈল বাঘাই এক সরকারি বক্তব্যে বলেন, ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চূড়ান্ত আলোচনা হয়নি। একইসঙ্গে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি খোলা বা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে ইরানি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে।

এর মধ্যেই ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেন, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলে পরবর্তী সপ্তাহ থেকেই সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু হতে পারে। এই ঘোষণায় আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়ে এবং নতুন সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়।

ইরান দাবি করছে, হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের আইনগত ও নৈতিক অধিকার রয়েছে। ইরানের আইন বিশেষজ্ঞ রেজা নাসরি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো জলপথ তখনই উন্মুক্ত থাকে যখন সেটি শুধুমাত্র বাণিজ্যিক যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু যদি সেই পথ ব্যবহার করে কোনো দেশ অন্য দেশের বিরুদ্ধে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করে, তবে উপকূলীয় রাষ্ট্র নিরাপত্তার স্বার্থে সেই পথ নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করার অধিকার রাখে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানসহ কিছু মধ্যস্থতাকারী দেশ দুই পক্ষের মধ্যে আস্থা ফেরানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে ট্রাম্পের আগ্রাসী অবস্থান এবং ইরানের কঠোর প্রতিক্রিয়ার কারণে আলোচনার পথ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দ্রুত কোনো সমঝোতা না হলে হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর