প্রচণ্ড গরমে মানুষের শরীরের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো হিট স্ট্রোক। এটি এমন একটি মারাত্মক অবস্থা, যা হঠাৎ করে ঘটে না; বরং তার আগে শরীর ধীরে ধীরে কিছু সতর্ক সংকেত দিতে থাকে। কিন্তু সচেতনতার অভাবে অনেকেই এসব লক্ষণকে গুরুত্ব দেন না, ফলে পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রাথমিক লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকলে হিট স্ট্রোক প্রতিরোধ করা অনেকটাই সম্ভব।
বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মতলেবুর রহমান এবং পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. সাইফ হোসেন খান জানান, গরমের সময় শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ঘামের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘামের মাধ্যমে শরীরের অতিরিক্ত তাপ বাইরে বের হয়ে যায়। কিন্তু অতিরিক্ত গরমে যখন শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হয়, তখন ঘাম উৎপাদন কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
এই অবস্থায় শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে থাকে, যা ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তারও বেশি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মস্তিষ্কসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। তখনই দেখা দেয় হিট স্ট্রোকের লক্ষণ। আক্রান্ত ব্যক্তি বিভ্রান্ত আচরণ করতে পারেন, এলোমেলো কথা বলতে পারেন, এমনকি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন। খিঁচুনি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
হিট স্ট্রোকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো শরীর একেবারে ঘামহীন হয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে, শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হতে পারে এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ যেমন লিভার, কিডনি ও মাংসপেশির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এটি প্রাণঘাতীও হতে পারে।
তবে এর আগে শরীর কিছু সতর্ক সংকেত দেয়। যখন শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা শুরু হয়, তখন মাথাব্যথা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, দুর্বলতা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেকেই এগুলোকে সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করেন। কেউ মনে করেন ঘুমের ঘাটতি বা কাজের চাপের কারণে এমন হচ্ছে। ফলে এসব উপসর্গ নিয়েই তারা দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যান।
প্রচণ্ড গরমে শরীর অবসন্ন হয়ে পড়ে। অনেক সময় বমিভাব হয়, এমনকি বমিও হতে পারে। মাথা ঘোরা, ঝিমঝিম ভাব বা হালকা লাগা—এসবই শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ। এ সময় মনোযোগ কমে যায়, কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে যায় এবং অল্পতেই বিরক্তি দেখা দেয়।
পেট কামড়ানো, পায়ের পেশিতে টান ধরা, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, ত্বক লালচে হয়ে যাওয়া—এসবও হিট স্ট্রোকের আগাম লক্ষণ হতে পারে। হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া এবং শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে যাওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। অনেক সময় মুখ ও গলা শুকিয়ে যায়, প্রচণ্ড তৃষ্ণা অনুভূত হয়। পানিশূন্যতার কারণে প্রস্রাবের রং গাঢ় হয়ে যায় এবং পরিমাণও কমে আসে।
এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে তা কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ হিট স্ট্রোক একটি মেডিক্যাল জরুরি অবস্থা। তাই প্রাথমিক পর্যায়েই ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রথমেই কাজ বন্ধ করে বিশ্রামে যেতে হবে এবং ঠান্ডা পরিবেশে থাকার চেষ্টা করতে হবে। শরীর ঠান্ডা করার জন্য মুখ, মাথা, ঘাড় ও শরীরে পানি ছিটানো যেতে পারে।
ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে নেওয়া কার্যকর একটি পদ্ধতি। বগল, ঘাড় এবং কুঁচকির মতো স্থানে বরফ বা ঠান্ডা কাপড় ব্যবহার করলে দ্রুত তাপমাত্রা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে শরীরে বাতাস চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। হাতপাখা বা রিচার্জেবল ফ্যান ব্যবহার করা যেতে পারে।
পানিশূন্যতা দূর করতে পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। শুধু পানি নয়, লবণ মেশানো পানীয়, ওরস্যালাইন বা ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ পানীয় গ্রহণ করা উচিত। ডাবের পানিও এ ক্ষেত্রে খুব উপকারী। এতে শরীর দ্রুত শক্তি ফিরে পায় এবং লবণ-পানির ভারসাম্য ঠিক থাকে।
হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি সবার জন্য সমান নয়। বয়স্ক ব্যক্তি ও ছোট শিশুদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কম থাকে, তাই তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তবে তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষও ঝুঁকির বাইরে নয়। বিশেষ করে যারা রোদে কাজ করেন—যেমন রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, ফেরিওয়ালা বা কৃষিশ্রমিক—তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি।
হিট স্ট্রোক প্রতিরোধে কিছু সহজ কিন্তু কার্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। গরমে বাইরে বের হলে ছাতা, সানগ্লাস ও পানি সঙ্গে রাখা উচিত। তৃষ্ণা লাগার অপেক্ষা না করে নিয়মিত পানি পান করা প্রয়োজন। চা-কফির মতো পানীয় কম খাওয়াই ভালো, কারণ এগুলো শরীরকে আরও পানিশূন্য করে তুলতে পারে।
পোশাকের ক্ষেত্রেও সচেতন হতে হবে। হালকা রঙের ঢিলেঢালা পোশাক পরা উচিত, যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে। খুব আঁটসাঁট পোশাক পরা এড়িয়ে চলা ভালো। রোদ থেকে বাঁচতে ফুলহাতা জামা ও লম্বা প্যান্ট বা পায়জামা পরা যেতে পারে।
খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনা জরুরি। গরমে ভারী ও তেলযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। পরিবর্তে এমন খাবার খেতে হবে, যাতে পানির পরিমাণ বেশি থাকে। রসালো ফল, শাকসবজি, ঝোলজাতীয় খাবার ও পাতলা ডাল শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে সাহায্য করে।
প্রচণ্ড রোদে বাইরে না যাওয়াই উত্তম। বিশেষ করে দুপুরের সময় যখন তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে, তখন ঘরে থাকার চেষ্টা করা উচিত। প্রয়োজনে কাজের সময়সূচি পরিবর্তন করা যেতে পারে। শরীরচর্চাও এমন সময়ে করা উচিত, যখন আবহাওয়া তুলনামূলক ঠান্ডা থাকে।
শুধু নিজের নয়, পরিবারের সদস্যদের প্রতিও নজর রাখা জরুরি। শিশুদের রোদে অতিরিক্ত খেলাধুলা থেকে বিরত রাখতে হবে। বয়স্কদের নিয়মিত পানি পান নিশ্চিত করতে হবে। কারও যদি পানি খাওয়ার বিষয়ে স্বাস্থ্যগত বিধিনিষেধ থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলা উচিত।
সমাজের অন্যদের প্রতিও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। যারা রোদে কাজ করেন, তাদের জন্য পানির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পথের প্রাণীদের জন্যও পানি রাখা একটি মানবিক উদ্যোগ। বাড়ির ছাদ বা বারান্দায় পাখিদের জন্য পানি রাখলে তারাও উপকৃত হয়।
পরিবেশ রক্ষার দিকটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আশপাশে গাছ লাগানো, পানির উৎস সংরক্ষণ করা এবং তাপমাত্রা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। পরিষ্কার পানির পাত্র ব্যবহার করা এবং নিয়মিত পানি পরিবর্তন করাও জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, হিট স্ট্রোক একটি প্রতিরোধযোগ্য কিন্তু মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। সচেতনতা, সময়মতো পদক্ষেপ এবং সঠিক অভ্যাস গড়ে তুললে এই ঝুঁকি অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব। নিজের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের সবার প্রতি নজর রাখলেই গরমের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সহজ হবে।