তীব্র দাবদাহ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জাপানের রাজধানী টোকিওতে সরকারি কর্মীদের পোশাকে এসেছে বড় পরিবর্তন। প্রচলিত স্যুট-টাইয়ের কড়াকড়ি শিথিল করে কর্মীদের এখন শর্টস পরে অফিসে আসার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে যেমন আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যও পূরণ করা হচ্ছে।
জাপানে দীর্ঘদিন ধরেই কর্মক্ষেত্রে ফরমাল পোশাকের প্রচলন রয়েছে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং জলবায়ুগত চ্যালেঞ্জের কারণে সেই রীতি ভাঙতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জাপানের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো চাপে পড়েছে। দেশটির মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে, যার বড় অংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। ফলে এই অঞ্চলে অস্থিরতা জাপানের জ্বালানি নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।
এই প্রেক্ষাপটে টোকিও মেট্রোপলিটন সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার কমাতে কর্মীদের হালকা ও আরামদায়ক পোশাক পরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে টি-শার্ট, পোলো শার্ট, স্নিকার্সের পাশাপাশি শর্টস পরার অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। এটি মূলত ২০০৫ সালে শুরু হওয়া ‘কুল বিজ’ কর্মসূচির সম্প্রসারিত রূপ।
টোকিও মেট্রোপলিটন সরকারের এক কর্মকর্তা জানান, তিনি প্রথমবারের মতো শর্টস পরে অফিসে এসেছেন। শুরুতে কিছুটা অস্বস্তি থাকলেও পরে বিষয়টি বেশ স্বাচ্ছন্দ্যদায়ক মনে হয়েছে। তার মতে, আরামদায়ক পোশাক কাজের দক্ষতা বাড়াতেও সহায়ক হতে পারে।
এই কর্মসূচির অন্যতম প্রবর্তক ছিলেন টোকিওর গভর্নর ইউরিকো কোইকে। তিনি বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ সরবরাহ ও চাহিদার পরিস্থিতি বিবেচনায় কর্মীদের আরও আরামদায়ক পোশাক পরতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। কাজের ধরন অনুযায়ী পোশাক বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়ায় কর্মীদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া দেখা যাচ্ছে।
শুধু জাপানই নয়, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এশিয়ার আরও কিছু দেশও পদক্ষেপ নিয়েছে। ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বাড়ি থেকে কাজ করার সুযোগ বাড়ানো, কর্মঘণ্টা কমানোসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসব পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে আনা।
জাপানে গত বছর ১৮৯৮ সালের পর সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্মকাল রেকর্ড করা হয়েছে। বর্তমানে অনেক এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি এতটাই চরম যে কর্তৃপক্ষ ‘নিষ্ঠুর গরম’ নামে নতুন সতর্কবার্তা চালু করেছে। এতে নাগরিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ১৯৭০-এর দশকের মতো জ্বালানি ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রয়োজন হতে পারে। তাই আগেভাগেই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে জাপান সরকার।
সব মিলিয়ে, পোশাকের এই পরিবর্তন শুধু একটি সাময়িক উদ্যোগ নয়, বরং জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশ সচেতনতার একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে আরও দেশ এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান