ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬,  ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাসই গড়বে সুস্থ প্রজন্ম: মীর শাহে আলম নাটোরে প্রবাসীর শপিং মলে হামলা ও লুটপাট, ৫ কোটি টাকার ক্ষতি জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চায় না বিএনপি সরকার: প্রতিমন্ত্রী তিন নিরাপত্তারক্ষীসহ অপহৃত কালাতের রাজপুত্র শাহজাদা আহমেদজাই 'আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' শব্দ নিষিদ্ধের ঘোষণা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নারী পরীক্ষকের সামনে পুরুষরা কম ব্যথা অনুভব করেন: নতুন গবেষণা উইন্ডিজের বিপক্ষে টস জিতে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ, একাদশে নেই মুশফিক! কাঁদুনে গ্যাসে ফরাসি বিক্ষোভকারীর মৃত্যু, পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ, দাবি বিরোধী নেতা আইজেনকোটের ফেনারবাখচেকে হারিয়ে ইউরোলিগে ভ্যালেন্সিয়ার দুর্দান্ত জয়

জ্বালানি সংকটে থমকে শিল্প, ঝুঁকিতে কর্মসংস্থান


  • আপলোড সময় : শনিবার ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ সময় : ১২:৪৫ পিএম

দেশের শিল্প খাত ক্রমেই গভীর সংকটে নিমজ্জিত হচ্ছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সরাসরি উৎপাদন, রফতানি এবং বিনিয়োগ পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক শিল্প এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পগুলো এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের অভাবে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থায় ফাটল ধরছে এবং তারা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকছে।

রফতানি খাতে ইতোমধ্যেই নেতিবাচক প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টানা আট মাস রফতানি আয় কমেছে। শুধু মার্চ মাসেই রফতানি কমেছে ১৮ শতাংশের বেশি। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় মার্চে আয় কমেছে প্রায় ৯ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষি ও পাটজাত পণ্য খাতেও এর প্রভাব পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে সামনে আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং জ্বালানি আমদানির অনিশ্চয়তা শিল্প খাতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। বড় শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতও মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।

দেশজুড়ে লোডশেডিং পরিস্থিতিও ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। শহরাঞ্চলে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেও গ্রামাঞ্চলে তা ১০ থেকে ১২ ঘণ্টায় পৌঁছেছে। এতে কৃষি, পোল্ট্রি ও মৎস্য খাতের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিদিন চাহিদার তুলনায় প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হচ্ছে। এর পেছনে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট বন্ধ থাকা এবং জ্বালানি সংকটকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের মতো বড় শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। সাদমা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, বিদ্যুতের চরম ঘাটতির কারণে শিল্প উৎপাদন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে এবং সময়মতো রফতানি অর্ডার সম্পন্ন করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সাভারের ট্যানারি শিল্পেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না, ফলে গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, জেনারেটর চালিয়েও ভারী যন্ত্রপাতি পুরোপুরি সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না, এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং খরচ বাড়ছে।

শিল্পাঞ্চলগুলোতে প্রতিদিন তিন থেকে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন সচল রাখতে উদ্যোক্তাদের জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের ডাইং কারখানাগুলোতে উৎপাদন ১০ টন থেকে কমে ২ টনে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জ্বালানি সংকটের কারণে ডিজেল সরবরাহও অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। সরকার ফুয়েল কার্ড চালু করলেও পাম্পে পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় উদ্যোক্তাদের বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে এবং পণ্যের দাম প্রতিযোগিতামূলক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন ব্যয়ে প্রভাব ফেলছে। ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব সর্বজনীন এবং এটি রফতানি খাতেও সরাসরি প্রভাব ফেলছে। উৎপাদন ও পরিবহন উভয় ক্ষেত্রেই খরচ বাড়ছে।

উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সময়মতো সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। অনেক অর্ডার ইতোমধ্যে ভারতসহ প্রতিযোগী দেশে চলে গেছে। সামনের মৌসুমের অর্ডারও অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদেশি ক্রেতারা আগাম অর্ডার স্থগিত করছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, আগামী কয়েক মাসে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে দেশ বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে ব্যাংক খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়তে পারে। একইসঙ্গে শ্রমিক ছাঁটাই, বেতন বকেয়া এবং শ্রম অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়ছে। উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, কোরবানির ঈদের আগেই শ্রম অসন্তোষ দেখা দিতে পারে।

শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন ও বিনিয়োগ উভয়ই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সব মিলিয়ে, গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট দেশের শিল্প খাতকে একটি বড় অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে দীর্ঘমেয়াদে রফতানি খাত, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর