বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) প্রথমবারের মতো নবজাতক ও শিশুদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি একটি ম্যালেরিয়া চিকিৎসা পদ্ধতির অনুমোদন দিয়েছে। এই অনুমোদনের মাধ্যমে আর্টেমেথার–লুমেফ্যান্ট্রিন নামের ওষুধটি এখন নবজাতক ও কম বয়সী শিশুদের জন্য নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্বীকৃতি পেল।
শুক্রবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, এই ওষুধটি প্রাক-যোগ্যতা অর্জন করেছে, যার অর্থ এটি গুণমান, নিরাপত্তা এবং কার্যকারিতার আন্তর্জাতিক মান পূরণ করেছে। এটি প্রথমবারের মতো এমন একটি ফর্মুলেশন, যা বিশেষভাবে নবজাতক ও ছোট শিশুদের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
এতদিন পর্যন্ত বড়দের জন্য তৈরি ম্যালেরিয়া ওষুধ দিয়েই শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হতো। এতে ডোজ নির্ধারণে ভুল, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং কখনও কখনও বিষক্রিয়ার ঝুঁকি থাকত। নতুন এই ফর্মুলেশন সেই ঝুঁকি অনেকাংশে কমাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়াসুস বলেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ম্যালেরিয়া পরিবার থেকে সন্তানদের স্বাস্থ্য, সম্পদ ও আশা কেড়ে নিয়েছে। তবে এখন নতুন টিকা, উন্নত রোগ নির্ণয় পরীক্ষা এবং শিশুদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি চিকিৎসা পরিস্থিতি পরিবর্তন করছে।
তিনি আরও বলেন, ম্যালেরিয়া নির্মূল এখন আর কেবল একটি স্বপ্ন নয়, বরং একটি বাস্তব সম্ভাবনা। তবে এটি অর্জন করতে হলে টেকসই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আর্থিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৮ কোটি ২০ লাখ মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রায় ৬ লাখ ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৯৫ শতাংশ রোগী ও মৃত্যু ঘটেছে আফ্রিকা মহাদেশে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই মৃত্যুর প্রায় তিন-চতুর্থাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ওষুধ ও কীটনাশকের প্রতি প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, রোগ নির্ণয়ে দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে।
নতুন অনুমোদিত এই ওষুধটি আফ্রিকার ম্যালেরিয়া-প্রবণ অঞ্চলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতি বছর জন্ম নেওয়া প্রায় তিন কোটি শিশুর চিকিৎসা ব্যবস্থায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরও জানায়, বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ দেশে এখনো ওষুধ ও স্বাস্থ্যপণ্য পর্যবেক্ষণের জন্য শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেই। এই ঘাটতি পূরণে তাদের প্রাক-যোগ্যতা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, যা নিশ্চিত করে যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবহৃত চিকিৎসা পণ্যগুলো নিরাপদ ও কার্যকর।
এই নতুন উদ্যোগকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন, বিশেষ করে শিশু মৃত্যুহার কমাতে এটি দীর্ঘমেয়াদে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে তারা মনে করছেন।