জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, এই যুদ্ধে ওয়াশিংটন কার্যত ‘অপমানিত’ অবস্থায় পড়েছে এবং এখন পর্যন্ত সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার কোনো কার্যকর কৌশল দেখা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, এই পরিস্থিতিতে ইরান কৌশলগতভাবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে চলে যাচ্ছে।
সোমবার (২৮ এপ্রিল) জার্মানির মার্সবার্গ শহরে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেন, আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো এতে জড়িয়ে পড়া নয়, বরং সেখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গভীর কৌশলগত সংকট তৈরি করেছে।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অতীত সামরিক অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে প্রবেশ করা যেমন কঠিন, তেমনি সেখান থেকে বেরিয়ে আসাও সমানভাবে জটিল ও ব্যয়বহুল।
মের্ৎস আরও বলেন, বর্তমান সংঘাতে ইরান কূটনৈতিক ও সামরিক উভয় দিক থেকেই তুলনামূলকভাবে কার্যকর কৌশল গ্রহণ করছে। বিশেষ করে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ভূমিকার কারণে তেহরান আলোচনার টেবিল এবং মাঠপর্যায়ে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে।
তার মতে, এই সংঘাত এখন শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বিস্তৃত কৌশলগত সংকটে পরিণত হয়েছে। সামরিক, কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক—সব ক্ষেত্রেই ওয়াশিংটন চাপের মধ্যে রয়েছে এবং পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তা আরও জটিল হয়ে উঠবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এর প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। ইতোমধ্যে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ ইউরোপীয় অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মের্ৎস দ্রুত যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই সংঘাত জার্মানির অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং উৎপাদন খাতে চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক শিপিং রুটগুলো ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
তিনি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালির কথা উল্লেখ করে বলেন, এই রুটে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে জার্মানি মাইন অপসারণকারী জাহাজ মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত আছে। তবে এটি কার্যকর হবে কেবল যুদ্ধবিরতি বা সংঘাত বন্ধ হলে।
অন্যদিকে, ইউরোপজুড়ে এই সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে চাপ সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতিতে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল জাতিসংঘে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি নিয়ে আলোচনার আগে সতর্ক বার্তা দেন।
তিনি বলেন, পারমাণবিক হুমকি এখনো বৈশ্বিক নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। যতদিন এই হুমকি থাকবে, ততদিন একটি কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা বজায় রাখা জরুরি।
ফ্রান্স ও জার্মানি সম্প্রতি পারমাণবিক প্রতিরোধ বিষয়ে সহযোগিতা জোরদার করেছে, যা ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।