রাশিয়া, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনার মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে রাশিয়ার আলোচিত সুপারইয়াট ‘নর্ড’। প্রায় ৪৬৫ ফুট দৈর্ঘ্যের এবং আনুমানিক ৫০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের এই বিলাসবহুল জাহাজটির এই যাত্রা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুপারইয়াট ‘নর্ড’ শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) গ্রিনিচ মান সময় দুপুর ২টার দিকে দুবাই মেরিনা থেকে যাত্রা শুরু করে। এরপর শনিবার সকালে এটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে এবং রবিবার ভোরে ওমানের মাসকাটে পৌঁছায়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এই বিলাসবহুল জাহাজটি নির্বিঘ্নে পথ পার হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শিপিং ডেটা বিশ্লেষণকারী প্ল্যাটফর্ম ‘মেরিন ট্রাফিক’-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই সংবেদনশীল জলপথ দিয়ে দৈনিক মাত্র কয়েকটি জাহাজ চলাচল করছে। যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ১২৫ থেকে ১৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজ এই রুট ব্যবহার করত, এখন সেই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে।
চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং নৌ-অবরোধ পরিস্থিতির কারণে এই অঞ্চলে অস্থিরতা বিরাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ বজায় রেখেছে বলে জানা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়ার একটি বিলাসবহুল সুপারইয়াটের নিরাপদে পারাপারকে অনেকেই মস্কো ও তেহরানের মধ্যকার কৌশলগত ঘনিষ্ঠতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
২০২৫ সালে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরের পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি দিয়ে রাশিয়ার জাহাজ চলাচল নতুন বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সুপারইয়াট ‘নর্ড’-এর মালিকানা নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা থাকলেও বিভিন্ন নথিপত্রে এটি রাশিয়ার ধনকুবের আলেক্সি মোর্দাসোভের সঙ্গে যুক্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও সরাসরি তার নাম মালিক হিসেবে উল্লেখ নেই, তবে ২০২২ সালে এটি তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি রুশ প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধিত হয়েছিল বলে জানা যায়।
এই প্রতিষ্ঠানটি রাশিয়ার চেরেপোভেতস শহরে অবস্থিত, যেখানে মোর্দাসোভের মালিকানাধীন বৃহৎ ইস্পাত কোম্পানি সেভারস্টাল-এর প্রধান কার্যালয় রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা দেশগুলো মোর্দাসোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
বিলাসবহুল এই সুপারইয়াটে রয়েছে ২০টি শয়নকক্ষ, একটি সুইমিং পুল, হেলিপ্যাড এবং একটি ছোট সাবমেরিন। এটিকে রাশিয়ার অতিধনীদের বিলাসী জীবনের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যখন রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করছেন, ঠিক সেই সময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে এই জাহাজের যাত্রা কূটনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথে এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করছে যে, বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপ সব পক্ষের ওপর সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে না।