মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান অচলাবস্থা এখন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা তৈরি করেছে। জ্বালানি তেল পরিবহণের প্রধান এই রুটে বিঘ্ন ঘটায় বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার জাহাজ এবং ২০ হাজার নাবিক পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে আছে, যারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে।
নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশেষ করে জ্বালানি তেল পরিবহণে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে সংকট দেখা দিতে পারে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতিতে।
গত মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বীমা কোম্পানিগুলো এই রুটকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে ঘোষণা করে ট্যাংকার জাহাজের জন্য ‘যুদ্ধ ঝুঁকি বীমা’ বাতিল করে দেয়। ফলে অনেক জাহাজ চলাচল করতে সক্ষম হলেও বীমা না থাকায় বাস্তবে তারা যাত্রা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এতে করে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, এই জলপথে পেতে রাখা নৌ-মাইন পরিষ্কার করতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগতে পারে। এর আগে পুরোপুরি নিরাপদভাবে জাহাজ চলাচল সম্ভব নয়। এই দীর্ঘ সময়ের অচলাবস্থা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্থির করে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে মাইন সরানো হলেও বীমা খরচ দীর্ঘদিন উচ্চ পর্যায়ে থাকবে। যতক্ষণ না কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক বা সামরিক সমঝোতা হয়, ততক্ষণ এই অনিশ্চয়তা কাটার সম্ভাবনা কম। ফলে ব্যবসায়ী ও জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের ২০ শতাংশের বেশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। তাই এই রুটে দীর্ঘস্থায়ী সংকট বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি নির্ভর দেশগুলোর জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, নিজেদের নাবিকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে তারা সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি। বরং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে পরিস্থিতি সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছে। ইরানের কনটেইনারবাহী জাহাজ ‘তোস্কা’-এর ছয় নাবিক ইতোমধ্যে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরেছেন।
তাসনিম নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ওমান উপসাগরে জাহাজটি নিয়ন্ত্রণে নেয়, যাতে ২৮ জন ইরানি নাবিক ছিলেন। ইরান এ ঘটনাকে ‘দস্যুতার শামিল’ বলে উল্লেখ করেছে এবং বাকি ২২ নাবিকের মুক্তির জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। দ্রুত সমাধান না হলে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর হতে পারে।
তথ্যসূত্র: আলজাজিরা