বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও বড় ধরনের উত্থান দেখেছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন খবরের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গতকাল বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি সাময়িকভাবে ১২২ ডলার পর্যন্ত ওঠে, পরে কিছুটা কমে আজ বৃহস্পতিবার সকালে ১২০ ডলারে স্থির হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে অনিশ্চয়তা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে নতুন করে অস্থির করে তুলেছে। বিশ্বের মোট তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়। ফলে এই রুটে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলেই সরাসরি বৈশ্বিক বাজারে তার প্রভাব পড়ে।
হোয়াইট হাউসে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে শেভরনসহ যুক্তরাষ্ট্রের বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের বৈঠক হয়। বৈঠকে আলোচনার মূল বিষয় ছিল, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর জ্বালানি সংকটের প্রভাব কীভাবে কমানো যায়। একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ এবং তেল বাজারের স্থিতিশীলতা নিয়েও আলোচনা হয়।
মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, এই বৈঠকটি নিয়মিত শিল্প-সংশ্লিষ্ট আলোচনার অংশ হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনার পর থেকেই ধারণা তৈরি হয়েছে যে হরমুজ প্রণালিতে চলমান উত্তেজনা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে দেশটির বন্দরগুলো ঘিরে অবরোধ আরও কঠোর করার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে ইরানও হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা অব্যাহত রাখা হবে।
গত কয়েক মাস ধরে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। সামরিক উত্তেজনার কারণে অনেক জাহাজ চলাচল বন্ধ বা সীমিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এরপর ইরান প্রণালির কাছাকাছি এলাকায় জাহাজ চলাচলে কঠোর সতর্কতা জারি করে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহের এই অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতিতে সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। ইতোমধ্যে ইউরোপের শেয়ারবাজারে পতন দেখা গেছে, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার বাজারেও ওঠানামা অব্যাহত রয়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও এই পরিস্থিতিতে বড় ধরনের চাপে পড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং তেল রপ্তানি হ্রাসের কারণে দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা আরও দুর্বল হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে লাখো মানুষ কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম আরও ২০ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা কমে না এলে তেলের বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি আরও চাপে পড়তে পারে।