চার মাস বয়সী একমাত্র সন্তান আবদুল্লাহ আল সাফওয়ানের লাশ নিয়ে ২২ দিনের লড়াই শেষে বাড়ি ফিরেছেন মা জান্নাতুল ফেরদৌস (২০) ও বাবা আবদুল্লাহ মো. রাসেল। জ্বর ও কাশি দিয়ে শুরু হওয়া অসুস্থতা শেষ পর্যন্ত হামের জটিলতায় রূপ নেয়। চিকিৎসার জন্য এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে বেড়ালেও শেষ রক্ষা হয়নি। শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার বিকেলে শিশুটির মৃত্যু হয়।
দেড় বছর আগে বিয়ে হওয়া জান্নাতুল ফেরদৌস ও আবদুল্লাহ মো. রাসেলের সংসারে চার মাস আগে জন্ম নেয় সাফওয়ান। সীমিত আয়ের এই পরিবারে নতুন অতিথিকে ঘিরে আনন্দের কোনো কমতি ছিল না। সন্তানের হাসি, কান্না, ছোট ছোট নড়াচড়া—সবই স্মার্টফোনে ধারণ করতেন মা। ভবিষ্যতে বড় হয়ে এসব দেখাবেন—এই স্বপ্নেই দিন কাটছিল তার।
কিন্তু ২২ দিন আগে হঠাৎ জ্বর ও কাশি দেখা দিলে সেই স্বপ্ন ভেঙে যেতে শুরু করে। স্থানীয় পল্লিচিকিৎসকের চিকিৎসায় অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় শিশুটিকে নিয়ে যাওয়া হয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানে শরীরে লাল ফুসকুড়ি দেখা দিলে চিকিৎসকরা জানান, এগুলো হামের লক্ষণ। উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া হলেও অর্থসংকটের কারণে পরিবারটি দিশেহারা হয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে শিশুটিকে সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে আবার ধারদেনা করে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও চিকিৎসকরা দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। ২১ এপ্রিল রাত আড়াইটার দিকে সেখানে পৌঁছায় সাফওয়ান।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে বাবা-মা সন্তানকে বাঁচানোর জন্য শেষ চেষ্টা চালিয়ে যান। একদিকে চিকিৎসা ব্যয়, অন্যদিকে সন্তানের জীবন বাঁচানোর আকুতি—সব মিলিয়ে পরিবারটি চরম সংকটে পড়ে। স্থানীয়দের কাছ থেকে ধার নেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সাহায্যের আবেদন করা হয়। বিভিন্ন ব্যক্তি সামান্য আর্থিক সহায়তা দিলেও তা যথেষ্ট ছিল না।
সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ৪ মাস ১০ দিন বয়সেই থেমে যায় সাফওয়ানের জীবন। বৃহস্পতিবার বিকেলে আইসিইউতে তার মৃত্যু হয়। একই দিন এশার নামাজের পর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে জেলায় হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে শতাধিক রোগী ভর্তি রয়েছে, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই নগর এলাকার। এ পর্যন্ত জেলায় হামে আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যার মধ্যে অনেকেই চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ফিরেছে।
সন্তান হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়া মা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, সন্তানের হাসিমুখ কখনো ভুলতে পারবেন না তিনি। যে সন্তানকে ঘিরে তাদের স্বপ্ন ছিল, সেই সন্তানই এখন শুধুই স্মৃতি।
অল্প আয়ের এই পরিবার এখন নিঃস্ব। চিকিৎসার ঋণ আর সন্তানের শূন্যতা—দুই ভারে তাদের জীবন থমকে গেছে।