ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

দুদকের তদন্তে নতুন তথ্য

সুপারস্টার গ্রুপকে নিয়মের ৪৬ গুণ বেশি ঋণ দিল প্রিমিয়ার ব্যাংক


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ১২ মে, ২০২৬ সময় : ৮:৩৩ এএম

অনিয়ম ও বিতর্ক যেন পিছুই ছাড়ছে না বেসরকারি খাতের Premier Bank PLC। এবার দেশের অন্যতম ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান Super Star Group-কে নির্ধারিত সীমার প্রায় ৪৬ গুণ বেশি ঋণ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, বন্ধকি জমির প্রকৃত মূল্য যাচাই ছাড়াই অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে ৪৬ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে, যা ব্যাংকটির জন্য বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করেছে।

জানা গেছে, যে জমি বন্ধক রেখে সুপারস্টার গ্রুপ ঋণ নিয়েছে, সেই জমির বিপরীতে নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৯৯ লাখ টাকা ঋণ পাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু অনিয়মের মাধ্যমে জমির মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেখিয়ে প্রায় ৪৬ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করা হয়। সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে দেখা গেছে, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মূল্যায়ন ছাড়াই বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়েছে।

১৯৯৪ সালে নারায়ণগঞ্জে ইনক্যান্ডিসেন্ট ল্যাম্প প্ল্যান্ট দিয়ে যাত্রা শুরু করা সুপারস্টার গ্রুপ বর্তমানে দেশের অন্যতম বড় ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ঢাকার তেজগাঁও শিল্প এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় অবস্থিত। লাইটিং, ফ্যান, কেবল, ওয়্যারিং অ্যাক্সেসরিজ ও সোলার পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও লিফট ব্যবসাতেও সম্পৃক্ত রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কোম্পানিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জালাল উদ্দীন।

এদিকে এটি প্রিমিয়ার ব্যাংকের বিরুদ্ধে ওঠা প্রথম অনিয়মের অভিযোগ নয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে ঋণ জালিয়াতি, অর্থপাচার, হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর এবং আমদানি নীতি লঙ্ঘনের মতো নানা অভিযোগে আলোচনায় আসে ব্যাংকটি। এসব অভিযোগ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থা তদন্তও চালাচ্ছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রিমিয়ার ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন সাত সদস্যের পর্ষদ গঠন করে। প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান ও উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার আরিফুর রহমানকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পরও ব্যাংকটি আর্থিক সংকট থেকে বের হতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংকটির সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮ টাকা। এ নিয়ে শেয়ারহোল্ডার ও কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।

এরই মধ্যে ৪৭৮ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমেছে Anti-Corruption Commission। অভিযোগ রয়েছে, প্রিমিয়ার ব্যাংকের মহাখালী শাখা থেকে সাতটি প্রতিষ্ঠানের নামে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুদকের সহকারী পরিচালক মাহাথীর মুহাম্মদ সামীরের নেতৃত্বে একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, মহাখালী শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক রানা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ আবসারসহ কয়েকজন কর্মকর্তা যোগসাজশের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ অনুমোদন করে ৪৭৮ কোটি টাকা তছরুপ করেছেন। অনুসন্ধান চলাকালে ২০২৫ সালের ১৮ মে রানা আব্দুল্লাহ আল আবসারের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

অন্যদিকে আমদানি জালিয়াতির ঘটনাতেও প্রিমিয়ার ব্যাংকের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, পুরান ঢাকার গোলাপ শাহ এন্টারপ্রাইজ অস্বাভাবিক কম মূল্য দেখিয়ে ভারত থেকে প্রায় ১২৫ কোটি টাকার পণ্য আমদানি করেছে। তিন বছরে প্রতিষ্ঠানটি মোট ২৩১টি এলসির বিপরীতে এক কোটি ৩ লাখ ডলারের আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রিমিয়ার ব্যাংকের মাধ্যমে ৪৬টি এলসিতে প্রায় ২৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকার আমদানি সম্পন্ন হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, কম দামে আমদানি দেখিয়ে সরকারকে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং বাকি অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রিমিয়ার ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যাও চেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বর্তমানে ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ২৭ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৭৮২ কোটি ১৭ লাখ টাকা। যদিও জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৫২৩ কোটি টাকা আদায় করায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। তবে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি এখনো ১০ হাজার ৪৮ কোটি টাকার বেশি।

ব্যাংকটির আর্থিক দুরবস্থার কারণে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশও দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের বেশি হলে সেই ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে না।

এ ছাড়া বিজ্ঞাপন প্রচারের নামে প্রায় ৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবালসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। অভিযোগ রয়েছে, ২০২০ সালে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচারের নামে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। যদিও চুক্তি অনুযায়ী পূর্ণ সময় বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়নি।

দুদকের অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মাইন্ডট্রি লিমিটেডের নামে ৪৩৮ কোটি ৭১ লাখ টাকার বেশি অগ্রিম অর্থ জমা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৯৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা এখনো অসমন্বিত রয়েছে।

এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে জানা গেছে, সাবেক চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবাল ও তার পরিবারের সদস্যরা বনানীর ইকবাল সেন্টারের ২০ ও ২১ তলার ভাড়া বাবদ ১০ কোটি ৩১ লাখ টাকা নিয়েছেন, যদিও ব্যাংক ওই ফ্লোর ব্যবহারই করেনি। বিষয়টিকে ব্যাংকিং বিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।


এ সম্পর্কিত আরো খবর