১৮২০ সালের ১২ মে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। তার বাবা উইলিয়াম এডওয়ার্ড নাইটিঙ্গেল এবং মা ফ্রান্সিস নাইটিঙ্গেল ছিলেন উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত সমাজের মানুষ। জন্মের সময় বাবা-মা ইতালি সফরে থাকায় শহরের নাম অনুসারে তার নাম রাখা হয় ‘ফ্লোরেন্স’।
ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী চিন্তার অধিকারী। সমাজের প্রচলিত জীবনধারা তাকে আকৃষ্ট করেনি। তিনি মানুষের সেবা করতে চাইতেন। কিন্তু তখনকার ইউরোপীয় সমাজে নার্সিং পেশাকে সম্মানজনক মনে করা হতো না। অভিজাত পরিবারের মেয়েরা সাধারণত এই পেশায় যুক্ত হতেন না। পরিবারও চায়নি তিনি নার্স হন।
কিন্তু ফ্লোরেন্স নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। মানুষের সেবাকেই তিনি জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেন। পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি নার্সিং শিক্ষায় যুক্ত হন। একসময় নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য তাকে পরিবার থেকে দূরেও সরে যেতে হয়েছিল।
১৮৫১ সালে জার্মানিতে নার্সিং প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে তার পেশাগত যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৮৫৩ সালে লন্ডনের ‘কেয়ার অব সিক জেন্টলওমেন ইনস্টিটিউট’-এর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এখান থেকেই মূলত আধুনিক নার্সিং ব্যবস্থাকে সংগঠিত রূপ দেওয়ার কাজ শুরু করেন তিনি।
তবে তার জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় শুরু হয় ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময়। ১৮৫৪ সালে যুদ্ধাহত ব্রিটিশ সৈনিকদের দুর্দশার খবর ইউরোপজুড়ে আলোড়ন তোলে। হাসপাতালে আহত সৈনিকদের চেয়ে সংক্রমণে মৃত মানুষের সংখ্যা ছিল বেশি। ওষুধের সংকট, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দূষিত পানি ও খাবারের অভাবে হাসপাতালগুলো কার্যত মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছিল।
এই অবস্থায় ১৮৫৪ সালের ২১ অক্টোবর ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল তার প্রশিক্ষিত ৩৮ জন সেবিকা, আত্মীয় মেই স্মিথ এবং ১৫ জন ক্যাথলিক নানকে সঙ্গে নিয়ে অটোমান সাম্রাজ্যের স্কুটারিতে পৌঁছান। বর্তমানে এটি তুরস্কের ইস্তাম্বুলের উসকুদার অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।
সেখানে গিয়ে তিনি যে ভয়াবহ বাস্তবতা দেখেছিলেন, তা তাকে নাড়িয়ে দেয়। প্রশাসনিক অবহেলায় আহত সৈনিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন। তিনি হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করেন, খাবারের মান উন্নত করেন এবং রোগীদের সেবার জন্য নতুন নিয়ম চালু করেন।
রাতের অন্ধকারে লণ্ঠন হাতে তিনি এক শয্যা থেকে আরেক শয্যায় ঘুরে ঘুরে আহতদের সেবা দিতেন। সেই দৃশ্য সৈনিকদের মনে এত গভীর ছাপ ফেলেছিল যে তারা তাকে ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ নামে ডাকতে শুরু করে।
ফ্লোরেন্স শুধু একজন সেবিকা ছিলেন না, তিনি ছিলেন দক্ষ পরিসংখ্যানবিদও। তিনি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখান, যুদ্ধক্ষেত্রে অধিকাংশ মৃত্যু সরাসরি যুদ্ধের কারণে নয়, বরং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সংক্রমণের কারণে ঘটছে। তার এই গবেষণা পরবর্তীতে হাসপাতাল ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে সহায়তা করে।
১৮৫৫ সালে নার্স প্রশিক্ষণের জন্য গঠিত হয় ‘নাইটিঙ্গেল ফান্ড’। মানুষের ব্যাপক সহায়তায় সেখানে বিপুল অর্থ সংগ্রহ হয়। এই তহবিলের অর্থ দিয়ে ১৮৬০ সালে লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাইটিঙ্গেল ট্রেনিং স্কুল’। বর্তমানে এটি ‘ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল স্কুল অব নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি’ নামে পরিচিত এবং কিংস কলেজ লন্ডনের অংশ।
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল শুধু ইউরোপেই নয়, ভারতবর্ষের স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি ভারতীয় গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে গবেষণা করেন এবং স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পরামর্শ দেন। তার গবেষণা ভারতবর্ষে আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
১৮৫৯ সালে তিনি লেখেন বিখ্যাত গ্রন্থ ‘নোটস অন নার্সিং’। এই বইটি পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে নার্সিং শিক্ষার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। বইটিতে তিনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রোগীর যত্ন, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও মানবিক সেবার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৮৮৩ সালে ব্রিটিশ রানি ভিক্টোরিয়া তাকে ‘রয়েল রেডক্রস’ পদকে ভূষিত করেন। ১৯০৭ সালে তিনি প্রথম নারী হিসেবে ব্রিটিশ সরকারের সর্বোচ্চ সম্মান ‘অর্ডার অব মেরিট’ লাভ করেন। এছাড়া ১৯০৮ সালে লন্ডন নগরীর ‘অনারারি ফ্রিডম’ উপাধিও পান।
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের জন্মদিন ১২ মে বিশ্বব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক নার্সেস ডে’ হিসেবে পালিত হয়। এই দিনটি শুধু একজন নারীর জন্মদিন নয়; এটি মানবসেবা, সহমর্মিতা ও আত্মত্যাগের প্রতীক।
১৯১০ সালের ১৩ আগস্ট ৯০ বছর বয়সে লন্ডনে নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। তবে মৃত্যুর শত বছর পরও তিনি বেঁচে আছেন প্রতিটি হাসপাতালের করিডরে, প্রতিটি সেবিকার মানবিক স্পর্শে এবং প্রতিটি অসুস্থ মানুষের আশার আলো হয়ে।
তিনি প্রমাণ করেছিলেন— নার্সিং শুধু একটি পেশা নয়, এটি মানবতার সবচেয়ে মহৎ সেবাগুলোর একটি।
আকাশজমিন / আরআর