ইসরায়েলি পার্লামেন্ট (নেসেট) সম্প্রতি একটি বিতর্কিত বিল অনুমোদন করেছে, যার মাধ্যমে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা শুরু হয়েছে।
সোমবার (১১ মে) রাতে অনুষ্ঠিত ভোটে বিলটি নেসেটে ১২০ আসনের মধ্যে ৯৩-০ ভোটে পাস হয়। বাকি ২৭ জন সংসদ সদস্য অনুপস্থিত ছিলেন বা ভোটদানে বিরত থাকেন।
নতুন আইনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় জড়িত বলে অভিযুক্তদের বিচার পরিচালনার জন্য একটি পৃথক আদালত বা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। এই ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতাও থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই আইন বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাদের দাবি, এটি ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং বিচার ব্যবস্থাকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করবে।
ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘুদের অধিকার বিষয়ক সংগঠন আদালাহ-র আইনজীবী মুনা হাদ্দাদ বলেন, এই আইন বিচারিক মানদণ্ড দুর্বল করে গণ-দোষী সাব্যস্ত করার পথ খুলে দিচ্ছে। তার মতে, এখানে এমন বিধান রাখা হয়েছে যা জোরপূর্বক নেওয়া স্বীকারোক্তি বা নির্যাতনের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যকেও আদালতে গ্রহণযোগ্য করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের পরিপন্থী।
নতুন আইনে আদালতের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। বিচার শুনানি, রায় এবং সাজা ঘোষণার মুহূর্তগুলো একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। আইনজীবীদের আশঙ্কা, এতে বিচার প্রক্রিয়া ‘শো ট্রায়াল’-এ পরিণত হতে পারে এবং অভিযুক্তদের নির্দোষ থাকার অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইসরায়েলের কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন—হামোকেদ, আদালাহ এবং পাবলিক কমিটি অ্যাগেইনস্ট টর্চার ইন ইসরায়েল—বিলটির কঠোর সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, ন্যায়বিচার অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ন্যূনতম মান বজায় রেখেই নিশ্চিত করতে হবে।
তারা সতর্ক করে বলেছে, এই আইন নির্দোষ ধরে নেওয়ার অধিকার, ন্যায্য শুনানি এবং মানবিক মর্যাদার মতো মৌলিক নীতিগুলোকে দুর্বল করে দিতে পারে।
এর আগে গত মার্চে ইসরায়েল আরেকটি আইন পাস করে, যেখানে ইসরায়েলি নাগরিকদের হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়। তবে সেটি ভবিষ্যৎ মামলার জন্য প্রযোজ্য ছিল এবং ২০২৩ সালের অক্টোবরের ঘটনার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়।
এদিকে ৭ অক্টোবরের হামলায় হামাসের নেতৃত্বাধীন অভিযানে ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী প্রায় ১ হাজার ১৩৯ জন নিহত হন এবং প্রায় ২৪০ জনকে জিম্মি করা হয়।
অন্যদিকে গাজায় পরবর্তী ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী সেখানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
হামাসের পক্ষ থেকে নতুন এই আইনকে সমালোচনা করে বলা হয়েছে, এটি গাজায় চলমান সংঘাত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো আড়াল করার চেষ্টা।
এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে তদন্ত করছে এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছে। ইসরায়েল অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।