মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এর দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। এতে এলএনজি আমদানিতে বিপুল ভর্তুকির চাপ তৈরি হয়েছে সরকারের ওপর। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। চলতি অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকির জন্য আট হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও যুদ্ধ শুরুর পর মাত্র দুই মাসেই সেই বরাদ্দের বড় অংশ শেষ হয়ে গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে জ্বালানি বাজারে। আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এখন প্রতি মাসে চার হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে।
বিশেষ করে স্পট মার্কেট থেকে আমদানি করা এলএনজি কার্গোর বিল ১৫ থেকে ১৭ দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়। ফলে দ্রুত অর্থ জোগাড় করে ভর্তুকির টাকা ছাড় করতে হচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়কে। এতে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
সূত্র জানায়, গত এপ্রিল মাসে এলএনজি আমদানিতে পেট্রোবাংলার ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় চার হাজার ২২০ কোটি টাকা। এই অর্থ ভর্তুকি হিসেবে ছাড়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করা হয়। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় ওই মাসে দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছাড় করে, যা দিয়ে আমদানির ব্যয়ের একটি অংশ পরিশোধ করা হয়েছে।
এদিকে চলতি মে মাসে ১১টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করেছে সরকার। এ জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে আরও তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকি ছাড়ের অনুরোধ জানিয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, মে মাসে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় দুই কার্গো, স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় এক কার্গো এবং স্পট মার্কেট থেকে আট কার্গো এলএনজি আমদানি করা হবে। এর মধ্যে মাসের প্রথম ১৫ দিনে ছয়টি এবং পরের ১৫ দিনে পাঁচটি কার্গো দেশে পৌঁছাবে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১১টি কার্গো আমদানিতে মোট ব্যয় হবে প্রায় সাত হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। বিপরীতে এসব গ্যাস বিক্রি করে পেট্রোবাংলার আয় হবে তিন হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় চার হাজার ১০০ কোটি টাকা।
তবে মে মাসের জন্য ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ৫০০ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকা চেয়েছে জ্বালানি বিভাগ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দ্রুত এ অর্থ ছাড় না হলে আমদানি ব্যয় পরিশোধে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি বিভাগ তাদের চিঠিতে আরও উল্লেখ করেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এলএনজির বিল পরিশোধ করতে না পারলে অতিরিক্ত সুদ গুনতে হবে সরকারকে। সেক্ষেত্রে সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট (এসওএফআর) এর সঙ্গে আরও ৪ থেকে ৫ শতাংশ সুদ যোগ হয়ে লেট পেমেন্ট চার্জ দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়লে সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়বে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকল্প জ্বালানি উৎস, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণে নতুন পরিকল্পনা নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।