কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামির প্রসিকিউশন—এমন খবর ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রায় তিন দশক আগের একটি ভয়াবহ ঘটনা। ওই ঘটনায় কিউবার সামরিক বাহিনীর গুলিতে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বেসামরিক উড়োজাহাজ ভূপাতিত হয়, প্রাণ হারান চারজন স্বেচ্ছাসেবক, যাদের মধ্যে তিনজন ছিলেন মার্কিন নাগরিক।
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৯০-এর দশকে, যখন কিউবার অর্থনৈতিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। নতুন জীবনের আশায় হাজারো মানুষ বিপজ্জনক সমুদ্রপথে ছোট ভেলা ও অস্থায়ী নৌযানে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এসব অভিবাসীকে সাহায্য ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত ছিল কিউবান–আমেরিকান সংগঠন ‘ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ’।
১৯৯৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সংগঠনটির আটজন স্বেচ্ছাসেবক তিনটি ছোট উড়োজাহাজে করে মায়ামি থেকে উড্ডয়ন করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সমুদ্রে ভাসমান বিপদগ্রস্ত কিউবানদের খুঁজে বের করা। কিন্তু তাদের এই অভিযান শেষ হয় ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে। কিউবার সামরিক বাহিনী মিগ যুদ্ধবিমান পাঠিয়ে দুটি উড়োজাহাজ গুলি করে ভূপাতিত করে। তৃতীয় উড়োজাহাজটি কোনোভাবে বেঁচে ফিরে আসে।
আন্তর্জাতিক মহলে এই ঘটনা তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। পরে প্রকাশিত রেডিও যোগাযোগের রেকর্ডে দেখা যায়, হামলায় অংশ নেওয়া পাইলটরা গুলি চালানোর পর উল্লাস প্রকাশ করছিলেন। এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সিলভিয়া জি ইরিওনদো বলেন, আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় দিনের আলোতে নিরস্ত্র উড়োজাহাজগুলোকে গুলি করে নামানো হয়, যা ছিল সম্পূর্ণ অমানবিক ও অবৈধ।
এই ঘটনার পর মায়ামির কিউবান–আমেরিকান সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৩০ বছর ধরে নিহতদের পরিবার, বেঁচে থাকা সদস্য এবং মানবাধিকারকর্মীরা কিউবার তৎকালীন সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিচার দাবি করে আসছেন। অভিযোগকারীদের মতে, সেই সময় কিউবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন রাউল কাস্ত্রো, যিনি পরে দেশটির প্রেসিডেন্ট হন।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ফ্লোরিডার মায়ামি অঞ্চলে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে জানা গেছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কয়েকজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, মামলায় মাদক পাচারসহ ১৯৯৬ সালের বিমান ভূপাতিত করার ঘটনাও যুক্ত হতে পারে।
তবে এখনো চূড়ান্ত হয়নি কতজনকে আসামি করা হবে বা কী ধরনের অভিযোগ আনা হবে। মামলাটি সামনে এগোলে এটি যুক্তরাষ্ট্র–কিউবা সম্পর্কের কূটনৈতিক সমীকরণেও নতুন প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
এই ঘটনার পেছনে রয়েছে কিউবা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিউবার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। ১৯৯৪ সালে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ সমুদ্রপথে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার চেষ্টা করেন, যাদের অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ ভেলায় যাত্রা করেন।
এর আগেই ১৯৯১ সালে গঠিত হয় ‘ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ’ সংগঠনটি। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সাবেক সিআইএ সদস্য ও বে অব পিগস অভিযানের সাবেক পাইলট হোসে বাসুলতো। তিনি ছোট বিমান ব্যবহার করে ফ্লোরিডা প্রণালীতে অভিবাসীদের খোঁজ করতেন এবং কোস্টগার্ডকে তথ্য দিতেন।
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে অভিবাসন চুক্তির ফলে সমুদ্রপথে পালানোর হার কিছুটা কমে আসে। এরপর সংগঠনটি শুধু উদ্ধারকাজেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং কিউবার আকাশসীমার কাছাকাছি উড়ে গিয়ে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার ঘটনাও ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কিউবার আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগে সংগঠনটির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। কিউবা সরকার তখন এটিকে উসকানিমূলক কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করত।
২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালের ঘটনায় উড়োজাহাজ দুটি নির্দিষ্ট সীমার কাছাকাছি পৌঁছালে কিউবার বিমান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ সতর্কবার্তা দেয়। তবে এরপরও উড়োজাহাজগুলো উড্ডয়ন অব্যাহত রাখে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মিগ যুদ্ধবিমান তাদের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়।
প্রথম উড়োজাহাজটি গুলি করার ৭ মিনিট পর দ্বিতীয় উড়োজাহাজটিও ভূপাতিত করা হয়। এতে নিহত হন চারজন স্বেচ্ছাসেবক, যাদের মরদেহ আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার পর কিউবার টেলিভিশনে সামরিক কর্মকর্তারা দাবি করেন, তারা সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন এবং নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থাগুলো এ ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে এটিকে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বলে উল্লেখ করে।
বর্তমানে এই পুরনো ঘটনা নতুন করে আলোচনায় আসায় কিউবান–আমেরিকান সম্প্রদায়ের মধ্যে বিচার পাওয়ার আশা আবারও জেগে উঠেছে।