যারা শরীরের বাড়তি মেদ ও অতিরিক্ত ওজন কমাতে চান, তাদের জন্য এক চমৎকার সুখবর নিয়ে এসেছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। এখন থেকে কোনো প্রকার কষ্টকর জিম বা কঠোর ডায়েট চার্ট অনুসরণ করা ছাড়াও বৈজ্ঞানিক উপায়ে সহজেই কমানো যাবে শরীরের ক্ষতিকর মেদ। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে গবেষকদের বরাতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি প্রকাশ করা হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের নতুন এই গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ ধরনের আইস ভেস্ট পরা কিংবা প্রতিদিন নিয়মিত ঠান্ডা পানিতে গোসল করা শরীরের অতিরিক্ত ওজন দ্রুত কমাতে দারুণভাবে সাহায্য করতে পারে। সহজ কথায়, নিয়মিত একটি নির্দিষ্ট মাত্রার ঠান্ডা তাপমাত্রার সংস্পর্শে থাকলে শরীরের ভেতরের চর্বি বা ফ্যাট নিজে থেকেই গলতে শুরু করে, যার জন্য জিমে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাম ঝরানোর কোনো প্রয়োজন পড়ে না।
বিশ্বজুড়ে ইদানীং ঠান্ডা পানিতে সাঁতার কাটা কিংবা বরফশীতল পানিতে ডুব দেওয়ার একটি নতুন প্রবণতা লক্ষ্য করা গেলেও, মানবশরীরে এর প্রকৃত স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নিয়ে এতদিন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য ছিল না। তবে সম্প্রতি অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার সমস্যায় ভোগা ৪৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে নিয়ে করা এক দীর্ঘ গবেষণায় অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক এবং ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব নটিংহাম ও নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত লেইডেন ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের গবেষকেরা যৌথভাবে এই পরীক্ষাটি চালিয়েছেন। তারা গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেক মানুষকে প্রতিদিন সকালে একটানা দুই ঘণ্টা করে বিশেষ এক ধরনের আইস ভেস্ট এবং কোমরে ঠান্ডা রাখার বেল্ট পরিধান করতে দেন। অংশগ্রহণকারীরা এই বিশেষ পোশাক পরে তাদের স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজকর্ম ও অফিসের কাজ অনায়াসেই চালিয়ে যান।
গবেষকদের তৈরি করা বিশেষ এই ভেস্ট ও বেল্টের ভেতরে ছিল জেলভর্তি কুলিং প্যাক, যা ব্যবহারের আগে সারা রাত ফ্রিজারে রেখে ঠান্ডা করা হতো এবং ব্যবহারের সময় এটি ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নিখুঁতভাবে বজায় রাখত। মাত্র ছয় সপ্তাহের এই গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীরা ঘরে বসেই গড়ে প্রায় ৯০০ গ্রাম বা প্রায় ২ পাউন্ড পর্যন্ত ওজন কমাতে সক্ষম হয়েছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কমে যাওয়া ওজনের প্রায় পুরো অংশটাই ছিল শরীরের ক্ষতিকর চর্বি। অন্যদিকে, যারা এই ভেস্ট ব্যবহার করেননি, তাদের ওজন না কমে বরং গড়ে ৬০০ গ্রাম পর্যন্ত বেড়ে গেছে। গবেষণার প্রধান গবেষক ডক্টর মেরিট বুন বলেন, অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতায় ভোগা মানুষের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে ঠান্ডার সুনির্দিষ্ট প্রভাব নিয়ে করা প্রথম দিকের গবেষণাগুলোর একটি এটি। এ ধরনের কুলিং ভেস্ট খুব সহজে ঘরেই ব্যবহার করা যায়।
ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ‘ইউরোপিয়ান কংগ্রেস অন অবিসিটি’-তে উপস্থাপিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, ঠান্ডা তাপমাত্রা শরীরের ক্যালোরি পোড়ানোর স্বাভাবিক হারকে অনেক বাড়িয়ে দেয়। গবেষণার অন্যতম সহলেখক এবং ইউনিভার্সিটি অফ নোটিংহামের প্রফেসর হেলেন ব্রাউন জানান, প্রতিদিন ঠান্ডার সংস্পর্শে থাকলে শরীরের ‘ব্রাউন ফ্যাট’ নামক একটি বিশেষ উপাদান সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা শরীর গরম রাখতে নিজে থেকেই চর্বি পোড়াতে শুরু করে। ডাচ হার্ট ফাউন্ডেশন ও ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত এই সফল গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, ঠান্ডা পানিতে গোসল করলেও একইভাবে হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখা সম্ভব কি না।