সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 69
সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজে পরীক্ষা চলাকালে এক শিক্ষার্থীর পায়ে গুলি করার বহুল আলোচিত ঘটনায় সেই প্রভাষক ডা. রায়হান শরীফকে অস্ত্র আইনের দুটি ধারায় ২১ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সোমবার (১৮ মে) দুপুরে সিরাজগঞ্জের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক জেলা ও দায়রা জজ ইকবাল হোসেন আসামির উপস্থিতিতে এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, আসামির পূর্বের হাজতবাসের দিনগুলো এই কারাদণ্ডের মেয়াদের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) রফিক সরকার।
দণ্ডপ্রাপ্ত ডা. রায়হান শরীফ সিরাজগঞ্জ শহীদ এম মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। তিনি সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর ও শহরের দত্তবাড়ী মহল্লার আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে। এই নৃশংস ঘটনার পর তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে স্বাস্থ্য বিভাগ। অন্যদিকে, এই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী আরাফাত আমিন তমাল (২২) বগুড়ার ধুনট উপজেলার ধামাচাপা গ্রামের আব্দুল্লাহ আল আমিনের ছেলে। তিনি ওই কলেজেরই তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
মামলার বিবরণ ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ মার্চ সিরাজগঞ্জ শহীদ এম মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজের একাডেমিক ভবনের চতুর্থ তলায় ক্লাস রুমে পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের মনে অহেতুক ভয়ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য বেআইনিভাবে বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো ছোরা নিয়ে পরীক্ষা নিচ্ছিলেন ডা. রায়হান শরীফ। এক পর্যায়ে তিনি শিক্ষকতার মতো পবিত্র পেশার চরম অবমাননা করে তার কাছে থাকা একটি ব্যাগ থেকে আচমকা পিস্তল বের করেন এবং সরাসরি শিক্ষার্থী আরাফাত আমিন তমালকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। গুলিটি সরাসরি তমালের ডান পায়ে গিয়ে লাগে এবং তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
এই আকস্মিক ও হিংগ্র ঘটনার পর ক্লাসরুমে থাকা সাধারণ শিক্ষার্থীরা চরম বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে এবং অপরাধীকে সোপর্দ করতে ডা. রায়হান শরীফকে ওই ক্লাস রুমের ভেতরেই আটকে রাখেন এবং দ্রুত স্থানীয় থানা পুলিশকে খবর দেন। সংবাদ পাওয়া মাত্রই পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত তৎপরতার সাথে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ সেখানে অভিযান চালিয়ে ডা. রায়হান শরীফের হেফাজত থেকে দুটি অবৈধ বিদেশি পিস্তল, বিপুল পরিমাণ তাজা গুলি, ম্যাগাজিন, ধারালো বিদেশি ছোরা ও চাকু উদ্ধার করে এবং তাকে হাতেনাতে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
এই ন্যক্কারজনক ঘটনার পর সিরাজগঞ্জ ডিবি পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) ওয়াদুদ আলী এবং ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী তমালের বাবা বাদী হয়ে সিরাজগঞ্জ সদর থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি ও পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ শেষে আদালত আজ এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পিপি রফিক সরকার এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে এই রায় একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।