কক্সবাজারের চকরিয়ায় সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জন হত্যা মামলায় চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা প্রমাণিত না হওয়ায় ৫ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। আজ বুধবার দুপুর ১২টার দিকে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (পঞ্চম) আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব ডুমখালী এলাকার মো. হেলাল উদ্দিন, নাছির উদ্দিন, মোর্শেদ আলম এবং রিংভং ছগিরশাহ কাটা এলাকার নুরুল আমিন। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে মোর্শেদ আলম নামের এক আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
আদালতের অতিরিক্ত পিপি খুরশিদ আলম চৌধুরী রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং আলামত পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা শেষে আদালত এই ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন। একই সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি অস্ত্র মামলারও রায় ঘোষণা করা হয়। সেই অস্ত্র মামলায় ১৩ জন আসামিকে দুটি পৃথক ধারায় ১৭ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং হত্যা মামলার মতো এই মামলাতেও ৫ জন আসামি খালাস পেয়েছেন। ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব মাইজপাড়া এলাকায় একটি ডাকাতি প্রতিরোধ অভিযানে গিয়ে ডাকাত দলের আকস্মিক ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান সেনাবাহিনীর তরুণ লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জন। এই বর্বরোচিত ঘটনার পর ২৫ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আবদুল্লাহ আল হারুনুর রশিদ বাদী হয়ে ১৭ জনের বিরুদ্ধে ডাকাতির প্রস্তুতিসহ হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে চকরিয়া থানার উপপরিদর্শক আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে একই আসামিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে আরেকটি মামলা করেন। দীর্ঘ ৪ মাস গভীর তদন্ত শেষে গত বছরের ১৯ জানুয়ারি ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়।
হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন চকরিয়া পৌরসভার জালাল উদ্দিন, মো. আনোয়ার হাকিম, চকরিয়া উপজেলার মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ, জিয়াবুল করিম, মো. ইসমাইল হোসেন, এনামুল হক, মোহাম্মদ এনাম, মো. কামাল এবং আবদুল করিম। অস্ত্র মামলাটিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৪ জনসহ মোট ১৩ জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে দুই মামলা থেকেই খালাস পাওয়া ব্যক্তিরা হলেন মো. ছাদেক, আনোয়ারুল ইসলাম, শাহ আলম, আবু হানিফ এবং বান্দরবানের লামা উপজেলার মিনহাজ উদ্দিন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী খুরশিদ আলম চৌধুরী বলেন, মূল হত্যা মামলায় বাদীপক্ষে মোট ৫২ জন সাক্ষী ছিলেন, যাদের আসামিপক্ষ দীর্ঘ জেরা করেছে। অন্যদিকে অস্ত্র মামলায় ৪৬ জন সাক্ষী ছিলেন এবং আসামিপক্ষে ৭ জন সাফাই সাক্ষী দিয়েছেন। আদালত সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া ও তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে এই যুগান্তকারী রায় প্রদান করেছেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী তৌহিদুল এহেছান বলেন, সমাজে আইনশৃঙ্খলা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে এই রায় একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। মামলার রায় ঘোষণার সময় ১৮ জন আসামির মধ্যে ১২ জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামির মধ্যে তিনজন কারাগারে থাকলেও একজন এখনো পলাতক। নিহত লেফটেন্যান্ট তানজিমের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলায়। তিনি ৮২তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সে ২০২২ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে আর্মি সার্ভিস কোরে (এএসসি) কমিশন লাভ করেছিলেন। দেশের সেবা করতে গিয়ে এই তরুণ সেনা কর্মকর্তার এমন অকাল ও নির্মম মৃত্যু পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল, যার সুষ্ঠু বিচার আজ সম্পন্ন হলো।