রফিকুল ইসলাম রাজু
একটি
সাত বছরের নিষ্পাপ শিশু, যার চুলে হয়তো
মা সকালে বেণি বেঁধে দিয়েছিলেন,
যার মুখে লেগে ছিল
আগামী দিনের এক চিলতে অমলিন
হাসি-সে আজ লাশ।
লাশ বললে ভুল হবে,
সে আজ একটি বিকৃত,
ক্ষতবিক্ষত ও মস্তকবিহীন অবয়ব।
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী এলাকায় সাত বছরের শিশু
রামিসা আক্তারকে (ছদ্মনাম) যেভাবে ইয়াবা আসক্ত ঘাতক সোহেল রানা
ও তার স্ত্রী স্বপ্না
আক্তার মিলে ধর্ষণ ও
নৃশংসতার চরম সীমায় গিয়ে
হত্যা করেছে, তা কোনো আদিম
বন্যতাকেও হার মানায়। এই
ঘটনার পর যখন সাংবাদিকরা
নিহত শিশুটির বাবা আবদুল হান্নান
মোল্লার মুখোমুখি হন, তখন তার
কণ্ঠ থেকে কোনো আকুতি
বের হয়নি, বের হয়েছে এক
বুক হিমশীতল পাথরচাপা ক্ষোভ। তিনি বলেছেন-
“আমি
বিচার চাই না, কারণ
আপনারা বিচার করতে পারবেন না।
আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড
নেই। আমার মেয়েও আর
ফিরে আসবে না। এটা
বড়জোর ১৫ দিন চলবে,
আবার কোনো ঘটনা ঘটবে।
এরপর এটা ধামাচাপা পড়ে
যাবে।”
একজন
বাবার এই যে বিচারব্যবস্থার
ওপর চরম অনাস্থা, রাষ্ট্র
ও সমাজের মুখের ওপর ছুঁড়ে দেওয়া
এই যে ধিক্কার, তা
কিন্তু অবান্তর বা অমূলক নয়।
এটি আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক নির্মম ও
বাস্তব প্রতিচ্ছবি। কারণ, এই রামিসা আক্তারের
নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাত্র এক বছর আগেই
২০২৫ সালের ৫ মার্চ মাগুরার
শ্রীপুর উপজেলায় আট বছরের আরেক
শিশু আছিয়া খাতুনকে একইভাবে পাশবিক ধর্ষণ ও হত্যা করা
হয়েছিল।
সবকিছু
প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও, নিম্ন
আদালতে ফাঁসির রায় হওয়ার পরও
এক বছর ধরে উচ্চ
আদালতের আপিলের আইনি গ্যাঁরাকলে ঝুলে
আছে সেই বিচার। আছিয়ার
খুনি হিটু শেখ যখন
কারাগারে রাষ্ট্রের অন্ন ধ্বংস করছে,
তখন তার মা আছিয়ার
স্মৃতি আঁকড়ে ধরে গাভির দুধ
বিক্রি করে কোনো রকমে
বেঁচে আছেন। প্রশ্ন ওঠে, যে দেশে
প্রকাশ্য প্রমাণ থাকার পরও আছিয়া হত্যার
বিচার এক বছরে কার্যকর
হয় না, সেই দেশে
কি রাতারাতি পল্লবীর রামিসা আক্তারের বিচার আদৌ করা সম্ভব?
নাকি আবদুল হান্নান মোল্লার আশঙ্কাই সত্যি হতে চলেছে-১৫
দিন পর আরও একটি
নতুন ঘটনার আড়ালে ধামাচাপা পড়ে যাবে রামিসা
হত্যার ফাইল?
মাগুরার আছিয়া হত্যা: যেখানে বিচারিক রায়ও আইনি গ্যাঁরাকলে বন্দি
বিচারের
দীর্ঘসূত্রতা কীভাবে একটি ভুক্তভোগী পরিবারকে
তিলে তিলে শেষ করে
দেয়, তার জলজ্যান্ত উদাহরণ
মাগুরার আছিয়া হত্যা মামলা। ২০২৫ সালের ৫
মার্চ বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে হিটু শেখ
নামের এক নরপশুর লালসার
শিকার হয় আট বছরের
আছিয়া। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে
ঢাকায় এনেও বাঁচানো যায়নি।
সেই সময়ে পুরো দেশ
ফুঁসে উঠেছিল, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজ
দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ শাস্তির
গালভরা আশ্বাস দিয়েছিল।
বিচারিক
আদালত তার দায়িত্ব পালন
করে আসামি হিটু শেখকে দ্রুততম
সময়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। কিন্তু
আমাদের দেশের প্রচলিত বিচারব্যবস্থার যে মন্থর গতি,
তা এখানেই দৃশ্যমান হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির উচ্চ
আদালতে আপিল করার আইনি
অধিকার রয়েছে এবং সেই আপিল
বিভাগের ডেথ রেফারেন্স ও
শুনানির দীর্ঘ লাইনে এসে আটকে গেছে
আছিয়ার আত্মা। আজ এক বছর
পার হয়ে গেলেও সেই
রায় কার্যকর করার কোনো লক্ষণ
নেই।
আছিয়ার
মা আয়েশা খাতুনের বুকে যে আগুন
জ্বলছে, তা নেভানোর কোনো
সদিচ্ছা যেন রাষ্ট্রযন্ত্রের নেই।
টিনের ঘরে বসে যখন
তিনি দেখেন তার মেয়ের খুনি
কারাগারে ভালো আছে, তখন
তার মনে এই সংশয়
জাগাটাই স্বাভাবিক যে-‘শেষে যদি
শেষ পর্যন্ত আসল বিচারই না
পাই!’ এই যে আছিয়া
মামলার রায় কার্যকর না
হওয়া, এটি আসলে সমাজের
অপরাধীদের কাছে একটি পরোক্ষ
বার্তা পাঠায়: “অপরাধ করলেও পার পাওয়া যায়,
কিংবা অন্তত আইনি মারপ্যাঁচে বছরের
পর বছর জীবন বাঁচিয়ে
রাখা যায়।”
পল্লবীর নৃশংসতা: ইয়াবা ও বিকৃত
যৌন লালসার এক ভয়াবহ কোলাজ
মাগুরার
আছিয়ার ক্ষত শুকাতে না
শুকাতেই ঢাকার পল্লবীতে ঘটে গেল ইতিহাসের
অন্যতম বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড। একই ভবনের পাশাপাশি
কক্ষে থাকা প্রতিবেশী সোহেল
রানা নামক এক মাদকাসক্তের
বিকৃত লালসার শিকার হতে হলো দ্বিতীয়
শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসাকে। আদালতে দেওয়া খুনি সোহেলের জবানবন্দি
পড়লে যেকোনো সুস্থ মানুষের শিরদাঁড়া দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত
বয়ে যাবে।
মাদক
বা ইয়াবা কীভাবে একজন মানুষকে পশুর
চেয়েও অধম করে তুলতে
পারে, তার প্রমাণ এই
সোহেল রানা। দরজা খোলার পর
ছোট্ট শিশুটিকে দেখে তার ভেতর
বিকৃত যৌন লালসা জাগ্রত
হয়। বাথরুমে নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণের
পর যখন শিশুটি তার
মা-বাবাকে বলে দেওয়ার কথা
বলে, তখন নিজের অপরাধ
ঢাকতে তাকে শ্বাসরোধ করে
হত্যা করা হয়। কিন্তু
নৃশংসতার এখানেই শেষ নয়। লাশ
গুম করার উদ্দেশ্যে সোহেল
এবং তার স্ত্রী স্বপ্না
আক্তার মিলে ধারালো চাকু
দিয়ে শিশুটির মাথা কেটে শরীর
থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলে, তার
যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করে এবং হাত
দুটি কাঁধের কাছ থেকে আংশিক
বিচ্ছিন্ন করে।
এই
পুরো প্রক্রিয়া চলাকালীন যখন বাইরে শিশুটির
মা দরজায় নক করছিলেন, তখন
খুনি স্বামীকে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যাওয়ার
সুযোগ করে দিতে স্ত্রী
স্বপ্না দীর্ঘক্ষণ দরজা বন্ধ করে
নাটক সাজায়। একটি সাত বছরের
শিশুর ওপর এই দম্পতি
যে পৈশাচিকতা চালিয়েছে, তা কেবল কোনো
একক অপরাধীর অপরাধ নয়; এটি আমাদের
সমাজের সামগ্রিক নৈতিক ধসের ও মাদকের
ভয়াল গ্রাসের চূড়ান্ত লক্ষণ।
বিচার ব্যবস্থার ওপর অনাস্থা: একজন বাবার ক্ষোভ বনাম রাষ্ট্রের ব্যর্থতা
পল্লবীর
ঘটনার পর শিশুটির বাবা
আবদুল হান্নান মোল্লা যে বক্তব্য দিয়েছেন,
তা আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
থেকে শুরু করে সুশীল
সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। “আপনারা
বিচার করতে পারবেন না,
আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড
নেই”-এই একটি বাক্য
আমাদের পুরো বিচারিক কাঠামোকে
কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়।
সাধারণ
মানুষ যখন কোনো অপরাধের
শিকার হয়, তখন তারা
আদালতের দ্বারস্থ হয়। কিন্তু যখন
একজন ভুক্তভোগী বাবা শুরুতেই বলে
দেন যে তিনি বিচার
চান না, তখন বুঝতে
হবে সমাজ ও রাষ্ট্র
তার সুরক্ষার ন্যূনতম নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
নেটিজেনরা ঠিকই বলেছেন, হান্নান
মোল্লার এই কথাটি আমাদের
বিচারহীনতার সংস্কৃতির সবচেয়ে নির্মম প্রতিচ্ছবি।
আমাদের
দেশে কোনো একটি বড়
অপরাধ ঘটলে তা নিয়ে
১৫-২০ দিন প্রচণ্ড
আলোড়ন হয়। টকশো গরম
হয়, গালভরা প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে যায়। কিন্তু
কিছুদিন পর যখন নতুন
কোনো রাজনৈতিক ইস্যু বা অন্য কোনো
অপরাধ সামনে আসে, তখন আগের
ঘটনাটি ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে থাকে।
মাগুরার আছিয়ার ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে।
ঘটনার সময় দেশজুড়ে যে
ক্ষোভ ছিল, এক বছর
পর আজ আছিয়ার মায়ের
পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।
এই চেনা বাস্তবতাই রামিসার
বাবাকে বিচার চাওয়ার অধিকার ও ইচ্ছা থেকে
বিমুখ করেছে।
আছিয়া থেকে রামিসা: কেন দ্রুত বিচার সম্ভব হয় না?
আইন
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ফৌজদারি
কার্যবিধির জটিলতা, তদন্তে গাফিলতি, সাক্ষীর অভাব এবং উচ্চ
আদালতে মামলার বিশাল জট বা ‘ব্যাকলগ’-এর কারণে যেকোনো
চাঞ্চল্যকর মামলার চূড়ান্ত রায় কার্যকর হতে
বছরের পর বছর, এমনকি
দশক পার হয়ে যায়।
বিচারিক
প্রক্রিয়া: নিম্ন আদালতের রায় ➔ উচ্চ আদালতে ডেথ
রেফারেন্স ও আপিল ➔ রিভিউ
আবেদন ➔
রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রার্থনা ➔
রায় কার্যকর
১.
আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা: নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর আইন অনুযায়ী
তা উচ্চ আদালতের ডেথ
রেফারেন্স সেকশনে যায়। সেখানে মামলার
সিরিয়াল আসতে আসতেই কয়েক
বছর কেটে যায়। এরপর
রয়েছে লিভ টু আপিল,
রিভিউ এবং সর্বশেষ রাষ্ট্রপতির
কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন। এই দীর্ঘ পথ
পরিক্রমা পার হতে হতে
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।
২.
তদন্তের দুর্বলতা ও প্রভাব: অনেক
সময় প্রভাবশালী অপরাধীরা লবিং বা অর্থের
জোরে তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার
চেষ্টা করে। যদিও রামিসা
বা আছিয়ার ক্ষেত্রে আসামিরা সরাসরি স্বীকারোক্তি দিয়েছে, তবুও আইনি মারপ্যাঁচে
সময়ক্ষেপণ ঠেকানো যায় না।
৩.
মাদকের বিস্তার ও সামাজিক উদাসীনতা:
পল্লবীর ঘটনায় স্পষ্ট যে, ইয়াবা আসক্তি
এই অপরাধের মূল অনুঘটক। রাষ্ট্র
যখন মাদক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ
হয়, তখন তার খেসারত
দিতে হয় রামিসাদের মতো
অবুঝ শিশুদের।
আছিয়ার রায় কার্যকর না হলে
রামিসার বিচার কি মরীচিকা?
এই
প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের সদিচ্ছার
ওপর। যদি মাগুরার আছিয়ার
খুনি হিটু শেখের ফাঁসির
রায় উচ্চ আদালতে দ্রুত
নিষ্পত্তি করে কার্যকর না
করা হয়, তবে পল্লবীর
রামিসা আক্তারের বিচার প্রক্রিয়াও যে একই গোলকধাঁধায়
আটকে যাবে—তা নিশ্চিত
করেই বলা যায়। অপরাধীরা
যখন দেখে যে আছিয়ার
খুনি অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও এক বছর
ধরে সুরক্ষিত অবস্থায় জেলে বেঁচে আছে,
তখন তারা পল্লবীর মতো
ঘটনা ঘটানোর সাহস পায়।
রামিসার
বাবার সেই ক্ষোভকে যদি
আমাদের ভুল প্রমাণ করতে
হয়, তবে রাষ্ট্রকে বিশেষ
ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই ধরনের শিশু
ধর্ষণ ও হত্যা মামলার
বিচারিক কার্যক্রম সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শেষ করতে হবে।
উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স শুনানির
জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে আছিয়া
এবং রামিসা—উভয় মামলার চূড়ান্ত
রায় আগামী কয়েক মাসের মধ্যে
কার্যকর করার দৃষ্টান্ত স্থাপন
করতে হবে।
সমাজ ও রাষ্ট্রের
শেষ সুযোগ
আমরা
এমন এক সমাজে বাস
করছি যেখানে শিশুরা আজ ঘরে, বাইরে
কিংবা প্রতিবেশীর কক্ষে কোথাও নিরাপদ নয়। আছিয়া থেকে
রামিসা—এই তালিকা দিন
দিন দীর্ঘতর হচ্ছে। যদি আমরা এখনো
জেগে না উঠি, যদি
আমাদের বিচারব্যবস্থা এই ধরনের পৈশাচিক
অপরাধের ক্ষেত্রেও ‘নগদ বিচার’ বা
দ্রুততম সময়ে শাস্তি নিশ্চিত
করতে না পারে, তবে
সমাজে আইনের শাসন বলে কিছু
অবশিষ্ট থাকবে না।
রামিসার বাবার কথাটি যেন চিরন্তন সত্যে পরিণত না হয়। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে এ দেশে বিচার করার রেকর্ড আছে, এ দেশে অপরাধীদের বুক কাঁপানোর মতো দৃষ্টান্ত আছে। আছিয়ার খুনি হিটু শেখ এবং রামিসার ঘাতক সোহেল রানা ও তার স্ত্রীর দ্রুততম সময়ে ফাঁসি কার্যকর করার মাধ্যমেই কেবল সমাজ থেকে এই বিচারহীনতার অন্ধকার দূর করা সম্ভব। অন্যথায়, আমাদের আগামী প্রজন্ম এক চিলতে হাসির বদলে কেবলই এক টুকরো লাশ হয়ে অবক্ষয়ের এই ভাগাড়ে অবলুপ্ত হয়ে যাবে।
আকাশজমিন / আরআর