গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভাটিকাপাসিয়া খেয়াঘাট জোরপূর্বক দখল করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মো. জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে। এ সময় বৈধ ইজারাদারের নৌকায় কর্মরত এক মাঝিকে নির্মমভাবে মারধর করে পা ভেঙে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় সুন্দরগঞ্জ থানায় একটি লিখিত এজাহার দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী ইজারাদার ও কাপাসিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি মো. হারুন-অর-রশিদ। অভিযুক্ত জামাল উদ্দিন কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভাটিকাপাসিয়া গ্রামের মো. ওসমান গনীর ছেলে।
লিখিত এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শুক্রবার (২২ মে ২০২৬) সকালে নিজের একদল সমর্থক নিয়ে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ভাটিকাপাসিয়া খেয়াঘাটে হাজির হন বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিন। এরপর তিনি জোরপূর্বক ঘাটের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজের লোকজন দিয়ে পারাপার ও টোল আদায় কার্যক্রম শুরু করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
স্থানীয়দের দাবি, এটি জামাল উদ্দিনের প্রথম ঘাট দখলের ঘটনা নয়। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়েও তিনি ১৪৩১ বঙ্গাব্দের অবশিষ্ট সময়ের জন্য এই ঘাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৪৩২ বঙ্গাব্দে পাঁচজনের সমন্বয়ে পরিচালিত খাস কালেকশনেও তিনি অন্যতম অংশীদার ছিলেন।
গাইবান্ধা জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার রজবখালী লটঘাট, মাটিয়াল ফারি ঘাট, চণ্ডিপুর, লালচামার ফারি, কাপাসিয়া-ভাটিকাপাসিয়া, উজান বুড়াইল-ভাটি বুড়াইল ও পোড়ারচর ঘাট নিয়ে গঠিত ৩ নম্বর প্যাকেজের আওতায় খেয়াঘাটগুলো ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত বৈধভাবে ইজারা দেওয়া হয়েছে। নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে লালচামার গ্রামের রিয়াজুল হকের ছেলে মো. হারুন-অর-রশিদ এই ইজারা লাভ করেন। জেলা পরিষদের সঙ্গে অকাট্য চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে ঘাট পরিচালনার অনুমতি দেওয়ার পর থেকে তাঁর লোকজনই ঘাট পরিচালনা করে আসছিলেন।
এজহার অনুযায়ী, ঘাট দখলের আগে থেকেই জামাল উদ্দিন ইজারাদার হারুন-অর-রশিদের কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন এবং চাঁদা না দিলে ঘাট দখলের হুমকি দেন। শুক্রবার সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে জামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে একদল লোক ঘাটে প্রবেশ করে ইজারাদারের নৌকায় কর্মরত মাঝি মো. কবির উদ্দিনকে টেনে নামিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করে। অভিযোগ রয়েছে, জামাল উদ্দিন নিজে লোহার রড দিয়ে কবির উদ্দিনের ডান পায়ের হাঁটুর নিচে আঘাত করলে তাঁর পা ভেঙে যায়। পরে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। হামলার পরও অভিযুক্তরা চাঁদা না পাওয়া পর্যন্ত ঘাট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার ঘোষণা দিয়ে ইজারাদারকে প্রাণনাশের হুমকি দেন।
টোল আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে কাপাসিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মো. জামাল উদ্দিন মারধর ও চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, 'স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে খেয়াঘাটটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৩০ টাকার পরিবর্তে ১০ টাকা করে টোল আদায় করা হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ খুশি।'
ভুক্তভোগী ইজারাদার ও ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি মো. হারুন-অর-রশিদ বলেন, 'বৈধ প্রক্রিয়ায় জেলা পরিষদ থেকে ঘাট ইজারা নিয়েছি। অথচ এখন জোরপূর্বক ঘাট দখল করে আমার মাঝিকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।'
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. বাবুল আহমেদ বলেন, 'কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সরকারি খেয়াঘাট জোরপূর্বক দখল নেওয়ার এখতিয়ার নেই। বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
গাইবান্ধা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) বিপুল চন্দ্র দাস বলেন, 'বৈধ ইজারাদার ছাড়া অন্য যে কেউ বিনামূল্যেও পারাপার করাতে চাইলে সেটি নিয়মবহির্ভূত হবে। জেলা পরিষদের অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি খেয়াঘাট পরিচালনা করতে পারবেন না।' সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ বলেন, 'শুক্রবার রাতে একটি লিখিত এজাহার পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
আকাশজমিন / আরআর