নীলফামারী প্রতিনিধি:
পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই নীলফামারীর সৈয়দপুরে শুরু হয়েছে এক ভিন্ন আমেজের পেশাগত কর্মব্যস্ততা। স্থানীয় পশুর হাটগুলো জমে ওঠার পাশাপাশি এই অঞ্চলের কসাই ও মাংস প্রস্তুতকারীরা রাজধানীমুখী হওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। প্রতিবছরের ধারাবাহিকতায় এবারও সৈয়দপুরের শতাধিক পেশাদার কসাই পবিত্র ঈদে ঢাকায় গিয়ে কোরবানির পশু জবাই, চামড়া ছাড়ানো, মাংস কাটাকাটি ও তা নিখুঁতভাবে ভাগ-বণ্টনের কাজে অংশ নিতে পুরোপুরি প্রস্তুত হয়েছেন।
স্থানীয় ও পারিপার্শ্বিক সূত্রে জানা গেছে, সৈয়দপুরের মাংস ব্যবসার সাথে জড়িত অনেক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই কসাই পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। বিশেষ করে এই অঞ্চলের বিহারি সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ পশু জবাই থেকে শুরু করে চামড়া ছাড়ানো এবং নিখুঁতভাবে মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণে অত্যন্ত দক্ষ। তাদের এই বিশেষ দক্ষতার কারণে রাজধানীর অভিজাত এলাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের অনেক পরিবারের কাছে সৈয়দপুরের কসাইদের চাহিদা দীর্ঘদিনের।
সৈয়দপুর মাংস ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নাদিম কোরাইশি, যিনি এলাকায় ‘ছোটু নাদিম’ নামে বেশ পরিচিত, জানান, ঈদের আগের দিন তাঁর নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি দক্ষ আভিযানিক দল বিমানযোগে (ফ্লাইটে) ঢাকায় রওনা হবে। ইতিমধ্যে তাঁদের যাতায়াতের সমস্ত টিকিট ও বুকিংয়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, “কোরবানির পশু দ্রুত ও ধর্মীয় নিয়ম মেনে জবাই করা থেকে শুরু করে মাংস কাটা এবং হাড় আলাদা করার প্রতিটি ধাপে বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন হয়। আমাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও সততার কারণে ঢাকার অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবার বছরের পর বছর আমাদের ওপর গভীর আস্থা রাখেন।”
তিনি আরও জানান, ছোটবেলা থেকেই বাবার হাত ধরে তিনি এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন এবং প্রায় দুই দশক ধরে কোরবানির ঈদের এই বিশেষ সময়ে ঢাকায় গিয়ে কাজ করছেন। গত বছর মাত্র ৪ সদস্যের দল নিয়ে রাজধানীতে ১২টি গরু জবাই ও মাংস কাটার কাজ করে প্রায় ২ লাখ টাকা আয় করেছিলেন। এবার দল বড় হওয়ায় কাজের পরিধি ও আয়— দুই-ই বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।
শুধু নাদিম কোরাইশিই নন, সৈয়দপুর পৌর মাংসহাটির আরও অনেক কসাই পৃথক পৃথক দল গঠন করে ঢাকায় যাওয়ার জোর প্রস্তুতি নিয়েছেন। কাজের সুবিধার্থে তাঁদের কেউ বিমানে, কেউ আন্তঃনগর ট্রেনে কিংবা লাক্সারি বাসে রাজধানীতে পৌঁছাবেন। স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্সিগুলো জানায়, ঈদের আগে রাজধানী থেকে মানুষ গ্রামে ফিরলেও ঢাকাগামী ফ্লাইটে যাত্রী তুলনামূলক অনেক কম থাকে; যার ফলে অনেক সময় বিমান ভাড়াও অনেকটা কমে যায়। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে কসাইদের একটি অংশ স্বাচ্ছন্দ্যে বিমান ভ্রমণ বেছে নেন।
পৌর মাংসহাটির কসাই মো. মিন্টু বলেন, ঈদের সময় নিজের পরিবারের সঙ্গে আনন্দ উদ্যাপন না করে মূলত বাড়তি অর্থ উপার্জনের আশায় তাঁরা কষ্ট করে ঢাকায় যান। তাঁর দাবি, সৈয়দপুরে একটি গরু জবাই ও মাংস কাটার জন্য যেখানে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পাওয়া যায়, সেখানে ঢাকায় একই কাজের জন্য কয়েক গুণ বেশি আয় করা সম্ভব হয়। ফলে ঈদের মাত্র ২-৩ দিনের কাজেই সারা বছরের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেন অনেকে।
আরেক স্থানীয় কসাই মোস্তাকিম জানান, তাঁর বাবাও বহু বছর ধরে ঢাকার ধানমন্ডি, গুলশান ও বনানীর বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির কাজ করতেন। এখন তিনি বাবার সেই ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক ধারা বজায় রেখেছেন। রাজধানীর অনেক পরিবার আগেভাগেই তাঁদের সাথে যোগাযোগ করে বুকিং নিশ্চিত করে রাখেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের থাকা-খাওয়ার রাজকীয় ব্যবস্থাও সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোই করে দেয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে সৈয়দপুরের কসাইদের এই ঢাকামুখী যাত্রা এখন শুধু একটি সাধারণ পেশাগত কার্যক্রম নয়, বরং এটি কয়েক দশকের পুরোনো একটি চমৎকার ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
আকাশজমিন / আরআর