স্টাফ রিপোর্টার
দেশের আর্থিক খাতে নজিরবিহীন অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সেলিম রহমানসহ চার পরিচালকের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউ (BFIU)। ব্যাংক হিসাব তলব করা অন্য ব্যক্তিরা হলেন সেলিম রহমানের স্ত্রী ও কেডিএস এক্সেসরিজ লিমিটেডের পরিচালক তাহসিনা রহমান, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এস এম শামীম ইকবাল এবং তাঁর স্ত্রী ও কেডিএস এক্সেসরিজ লিমিটেডের পরিচালক হাসিনা ইকবাল। তাঁরা সকলেই চট্টগ্রামের বিতর্কিত ব্যবসায়িক গোষ্ঠী কেডিএস গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ, বিদেশে অর্থ পাচার এবং করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) খাতের কোটি কোটি টাকা লুটপাটের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যাংকের প্রকৃত বিনিয়োগের তথ্য গোপন রাখা এবং নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিদের অনুকূলে বিপুল পরিমাণ পাওনা অবৈধভাবে অবলোপন (রাইট অফ) করা। এসব অনিয়মের মাধ্যমে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান ‘আল-আরাফাহ ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড’-কে সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার অভিযোগও রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক অডিট প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে দেখা গেছে, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ফাউন্ডেশন থেকে সিএসআর খাতের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের উদ্দেশ্যে কম্বল কেনা হয়েছিল। ব্যাংকের অর্থায়নে কেনা সেই ২০ থেকে ২৫ হাজার কম্বল নিজের নামে বা কেডিএস গ্রুপের ব্যানারে বিতরণের মাধ্যমে তাঁরা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করেছেন। কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান এসব কম্বল তাঁর গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার সাইদাইর গ্রামে বিতরণ করেছেন। অর্থাৎ, ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ দিয়ে কেনা কম্বল দিয়ে তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার কাজে ব্যবহার করেছেন।
এই গ্রুপের দুর্নীতির পরিধি কেবল আল-আরাফাহ্ ব্যাংকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ৪৫৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে প্রাথমিকভাবে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এই গুরুতর অপরাধের দায়ে গত ২ ফেব্রুয়ারি তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের সাতটি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। একইসঙ্গে তাঁর আরেক পুত্র ইয়াসিন রহমান ওরফে টিটু একটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন, যা পুরো পরিবারটির অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরে।
কেডিএস গ্রুপ শুধু আল-আরাফাহ্ ব্যাংককেই ধ্বংস করেনি, বরং দেশের প্রথম বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ন্যাশনাল ব্যাংককেও দেউলিয়া করার পথে নিয়ে গিয়েছিল। বিগত সরকারের রাজনৈতিক মদদপুষ্ট হয়ে খলিলুর রহমান ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে এবং তাঁর ছেলে সেলিম রহমান আল-আরাফাহ ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই যোগসাজশের মাধ্যমে তাঁরা দুটি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংককে নিজেদের ব্যক্তিগত লুটপাটের আখড়ায় পরিণত করেছিলেন। তাঁদের সীমাহীন লোভ ও অনিয়মের কারণে ব্যাংক দুটি আজ খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে।
আর্থিক খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক দুটিকে ধ্বংস করার পেছনে কেবল আর্থিক অনিয়মই নয়, বরং গভীর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ষড়যন্ত্র কাজ করেছে। বিএফআইইউ-এর এই ব্যাংক হিসাব তলবের সিদ্ধান্তকে একটি ইতিবাচক ও সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁরা মনে করেন, কেবল হিসাব তলব নয়, বরং ব্যাংক লুটপাটের সঙ্গে জড়িত এই সিন্ডিকেটের প্রতিটি সদস্যকে আইনের আওতায় এনে তাদের পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।
ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বিএফআইইউ এখন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অভিযুক্তদের ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ স্থানান্তর বা উত্তোলন বন্ধ করার মধ্য দিয়ে তাঁদের দেশত্যাগের পথও সংকুচিত হয়ে আসছে। এটি নিশ্চিত যে, বিগত বছরগুলোতে যারা ব্যাংক খাতকে ব্যক্তিগত সম্পদের ভাণ্ডার মনে করেছিলেন, তাঁদের জবাবদিহিতার আওতায় আসতে হচ্ছে। সাধারণ গ্রাহকদের আমানতের সুরক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ধারাবাহিক তদারকি ও তদন্ত প্রক্রিয়া আগামী দিনে আরও কঠোর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কেডিএস গ্রুপের পরিচালকদের ব্যাংক হিসাব তলবের মাধ্যমে আর্থিক খাতে লুটপাটকারীদের একটি বড় সিন্ডিকেট চিহ্নিত হলো, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আকাশজমিন / আরআর