আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নজিরবিহীন ঘটনা। প্রবল বিক্ষোভ, গণধোলাই ও তীব্র জনরোষের মুখে পড়েছেন সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শনিবার (৩০ মে) দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সোনারপুরে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় নিহত এক দলীয় কর্মীর বাড়িতে যাওয়ার পথে এই হামলার শিকার হন তিনি। প্রথমে কামালগাজির কাছাকাছি এলাকায় একদল নারী তাকে কালো পতাকা দেখান। এরপর তিনি সোনারপুরে প্রবেশ করতেই তাকে লক্ষ্য করে চারদিক থেকে একের পর এক ডিম ও জুতা-চপ্পল নিক্ষেপ করা শুরু হয়। এ সময় উত্তেজিত জনতা তাকে উদ্দেশ্য করে ‘চোর’ স্লোগান দিতে থাকে। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা তার ওপর চড়াও হয়ে এলোপাতাড়ি চড়, থাপ্পড়, ঘুষি ও লাথি মারতে শুরু করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে নিরাপত্তারক্ষীরা দ্রুত তার মাথায় হেলমেট পরিয়ে কোনো রকমে ঘটনাস্থল থেকে তাকে অক্ষত অবস্থায় বের করে নিয়ে যান।
অবশ্য এই বিধ্বস্ত অবস্থার মধ্যেই অবশেষে নিহত দলীয় কর্মী সঞ্জু কর্মকারের বাড়িতে পৌঁছাতে সক্ষম হন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। গত ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর এটাই ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম কোনো প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি। শনিবার মূলত নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় আক্রান্ত ও নিহত তৃণমূল কর্মীদের বাড়িতে যাওয়ার কর্মসূচি নিয়েছিলেন তিনি।
প্রসঙ্গটি নিয়ে জানা গেছে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সোনারপুরে পৌঁছানোর আগেই সেই এলাকায় স্থানীয় নারীরা জুতা, চপ্পল, ডিম ও কালো পতাকা নিয়ে বিক্ষোভের জন্য ওত পেতে দাঁড়িয়ে আছেন— এমন একটি গোপন তথ্য পুলিশের কাছে ছিল। পুলিশের পক্ষ থেকে এই তথ্যটি আগেই অভিষেককে জানানো হয়েছিল। আর এই কারণেই তিনি সোনারপুরে ঢোকার মুখে নিজের চার চাকার কনভয় বা গাড়ির বহর ছেড়ে সাধারণ মোটরবাইকে করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু মোটরবাইকে চড়তেই পরিস্থিতি আরও বেশি ঘোলাটে ও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে ওঠে।
বিধ্বস্ত ও রক্তাক্ত চশমা পরিহিত অবস্থায় নিহত তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে পৌঁছে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন অভিষেক। নিহত কর্মীর ছবির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি এই নজিরবিহীন হামলার জন্য পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তথা বিজেপি (BJP) সরকারকে সরাসরি দায়ী করে নিশানা করেন। অভিষেক বলেন, ‘আমার মাথাটা আজ অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে কারণ মাথায় হেলমেট পরা ছিল। হামলাকারীরা মারধর করে আমার চশমা ভেঙে দিয়েছে। আমি হয়তো এভাবেই কোনোভাবে এখান থেকে জীবন নিয়ে বেরিয়ে যাব, কিন্তু আমার যাওয়ার পর তো এই সঞ্জু কর্মকারের অসহায় ও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওপর তারা নতুন করে চড়াও হবে।’
তিনি আরও হুঙ্কার দিয়ে বলেন, ‘তারা আমায় মারতে চায়? মেরে দিক! কিন্তু আমি এখান থেকে কোথাও যাব না। সঞ্জুর এই বৃদ্ধ বাবা-মাকে এই বিপদের মুখে ফেলে আমি কোথাও যাব না। আমি এই পুরো ঘটনাটি নিয়ে হাইকোর্ট এবং রাজ্যপালের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছি। হামলাকারীরা এখন নিহত তৃণমূল কর্মীর বাড়ির দরজাও ভাঙার চেষ্টা করছে। অথচ এখানে প্রশাসনের বা পুলিশের কেউ নেই। আমি এসপি (SP) এবং আইসিকে (IC) দ্রুত পুলিশ পাঠাতে বলতে বলেছি, কিন্তু এখনও কোনো অতিরিক্ত বাহিনী এখানে এসে পৌঁছায়নি।’
উল্লেখ্য, বাইরে যখন তার বিরুদ্ধে এই তীব্র জনরোষ আছড়ে পড়ছে, ঠিক তখন দলের অভ্যন্তরেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে চলছে তুমুল অসন্তোষ ও বিদ্রোহ। এর মধ্যেই বিধানসভার পরিষদীয় দলনেতা চূড়ান্ত করার বিষয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দলের একাধিক বিধায়কের সই জাল করেছেন বলে খোদ তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরেই গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বন্ধ খামে সেই জালিয়াতির অভিযোগ ইতিমধ্যেই বিধানসভা ভবন পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এরপরই এই সই জালকাণ্ডে তার বিরুদ্ধে রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে সিআইডি (CID) তদন্ত। শনিবার দুপুর ১টা ২০ মিনিট নাগাদ হরিশ মুখার্জি রোডে অবস্থিত অভিষেকের নিজস্ব বাসভবন ‘শান্তিনিকেতন’-এ হানা দেয় রাজ্য সিআইডির একটি বিশেষ তদন্তকারী দল। তবে তার বাড়ির নিরাপত্তারক্ষী এবং উপস্থিত কর্মীরা সিআইডিকে জানান, তৃণমূল নেতা বা তার পরিবারের কেউ বর্তমানে এই বাড়িতে নেই।