ইরানে মে মাসে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর দেখা যায়নি। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ক্রেতাদের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মে মাসেই সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আমাদের নিশ্চিতভাবেই আরও উচ্চ মূল্যের মুখোমুখি হতে হবে। আমরা লড়াই করছি এবং আমাদের অবশ্যই এই কষ্ট মেনে নিতে হবে।’ তাঁর এই বক্তব্য দেশটির চলমান অর্থনৈতিক সংকটের গভীরতাকেই তুলে ধরে।
ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পণ্য ও সেবামূল্য পরিমাপক ভোক্তা মূল্যসূচক গত বছরের মে মাসের তুলনায় এ বছরের মে মাসে ৭৭.২ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি গত এপ্রিলের তুলনায় ৮.৫ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে ওষুধ, ট্যাক্সি ভাড়া, তামাক এবং যোগাযোগ ব্যয়ের মতো দৈনন্দিন খাতে মুদ্রাস্ফীতি ১১৩.৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নৌ-অবরোধ, তেল রপ্তানিতে বাধা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা ইরানের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলছে। দেশটির রিয়াল মুদ্রা বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় রাজস্ব আয়ও কমে গেছে।
২০১৫ সালে যেখানে প্রতি ডলারের বিপরীতে রিয়ালের বিনিময় হার ছিল ৩২ হাজার, বর্তমানে তা বেড়ে ১৭ লাখ রিয়ালের বেশি হয়েছে, যা অর্থনৈতিক অবমূল্যায়নের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। একই সঙ্গে দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও রাজস্ব কাঠামোও চাপের মধ্যে রয়েছে।
ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যকে ‘নজিরবিহীন’ বলে বর্ণনা করেছে বামদাদ ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক স্টাডিজ। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পরিসংখ্যানের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা নিয়ে মন্তব্য করেনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফারারু নিউজে প্রকাশিত এক মন্তব্যে অর্থনীতিবিদ মহসেন জলিলবান্দ বলেন, রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে।
অতীতে ইরানে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বড় ধরনের বিক্ষোভের ইতিহাস রয়েছে। ২০১৭-১৮ সালের খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিক্ষোভে প্রাণহানি ও ব্যাপক গ্রেফতারের ঘটনা ঘটে। চলতি বছরের শুরুতেও রিয়ালের দরপতনের কারণে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়।
অর্থনীতিবিদ সাঈদ লেইলাজ সতর্ক করে বলেছেন, বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে এবং ইরানের সমাজ ২৫ শতাংশের বেশি মুদ্রাস্ফীতি দীর্ঘদিন সহ্য করতে পারে না। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে সামাজিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি করছে। শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটির অর্থনীতি একদিকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ দুর্বল কাঠামোর কারণে চরম সংকটে রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে নতুন করে বিক্ষোভের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।