বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি দেশের ওপর অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছে যুক্তরাষ্ট্র। জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ না নেওয়াকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে এই প্রস্তাব ঘোষণা করেছে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (ইউএসটিআর)। মঙ্গলবার (২ জুন) এই প্রস্তাবটি ঘোষণা করা হয় বলে জানা গেছে।
ইউএসটিআরের দাবি, ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১(বি) ধারা ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের ব্যর্থতা মার্কিন শ্রমিকদের জন্য অসম প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করছে। তাদের মতে, জোরপূর্বক শ্রমবিরোধী নীতি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করায় বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আংশিক বাণিজ্য চুক্তি বা ব্যবস্থা রয়েছে, তাদের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। আর যেসব দেশের ক্ষেত্রে এমন কোনো ব্যবস্থা নেই, তাদের ক্ষেত্রে এই হার সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
প্রাথমিক তালিকায় বাংলাদেশ, ভারত, চীন, জাপান, যুক্তরাজ্য, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডসহ মোট ৫৪টি দেশকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া কানাডা, মেক্সিকো ও পাকিস্তানসহ আরও কয়েকটি দেশকে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউএসটিআরের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত এখনই কার্যকর হচ্ছে না। এটি বর্তমানে পর্যালোচনাধীন রয়েছে এবং আগামী ৬ জুলাই পর্যন্ত এ বিষয়ে লিখিত মতামত জমা দেওয়ার সুযোগ থাকবে। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়েছে, পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে একটি আলাদা ব্যবস্থা রাখা হতে পারে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য তুলনামূলক কম শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ পাবে। তবে এই কোটার পরিমাণ ও বিস্তারিত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
নতুন এই নীতিতে বলা হয়েছে, যেসব দেশ ইতোমধ্যেই জোরপূর্বক শ্রম নিষিদ্ধ করেছে বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে এ ধরনের বিধান কার্যকর করেছে, তাদের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক প্রযোজ্য হবে। অন্যদিকে যেসব দেশ এ ধরনের কোনো কাঠামোর বাইরে রয়েছে, তাদের জন্য ১২.৫ শতাংশ শুল্ক প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও কানাডা, ইকুয়েডর, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান এবং যুক্তরাজ্য রয়েছে, যাদের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়েছে।
বাকি প্রায় ৪৫টি দেশের ওপর ১২.৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে ইউএসটিআর।
এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ট্রাম্প প্রশাসনের ২০ ফেব্রুয়ারিতে আরোপ করা ১০ শতাংশ অস্থায়ী শুল্কের মেয়াদ আগামী ২৪ জুলাই শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পর আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের আওতায় শুল্ক আরোপের ক্ষমতা নিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে বলেও জানা গেছে।
ইউএসটিআর আরও জানিয়েছে, চীনসহ ১৬টি বাণিজ্য অংশীদার দেশের শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলাদা তদন্তের ফলাফল শিগগিরই প্রকাশ করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই শুল্ক প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর রপ্তানি খাত চাপের মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়, কারণ দেশের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, জোরপূর্বক শ্রম সংক্রান্ত শুল্কের আওতায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাত যেমন জ্বালানি, বিরল মৃত্তিকা, নির্দিষ্ট ধাতু, গরুর মাংস, কফি, ফল ও সবজি, ওষুধ, জৈব রাসায়নিক এবং বিমানের যন্ত্রাংশকে ছাড় দেওয়া হতে পারে।
বিশ্ব বাণিজ্য পরিস্থিতিতে নতুন এই প্রস্তাব ঘিরে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে এখন নজর রয়েছে বিভিন্ন দেশের রপ্তানি খাত ও নীতিনির্ধারকদের।