দক্ষিণ ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানা স্মরণকালের অন্যতম প্রলয়ংকরী ও বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার এই অত্যন্ত শক্তিশালী ও ভয়াবহ ভূমিকম্পের আঘাতে নিহতের সংখ্যা পূর্বের তুলনায় আরও বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে অন্তত ৩৫ জনে গিয়ে পৌঁছেছে। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৩৪ জন মানুষ, যাদের অনেকের অবস্থাই অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। হতাহতের এই সংখ্যার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগটির তীব্রতায় প্রায় ১০ হাজার পরিবার সম্পূর্ণ গৃহহীন বা বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে বলে ফিলিপাইনের সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। বাস্তুচ্যুত এই বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য বর্তমানে জরুরি আশ্রয় শিবির ও ত্রাণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
বিধ্বংসী এই ভূমিকম্পটি সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে ফিলিপাইনের দক্ষিণ উপকূলে প্রথম আঘাত হানে। ভূ-পৃষ্ঠের গভীর থেকে আসা এই শক্তিশালী কম্পনের পরপরই ফিলিপাইন ছাড়াও পার্শ্ববর্তী দেশ ইন্দোনেশিয়া, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে সাগরের পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে বড় ধরনের সুনামি আঘাত হানার তীব্র সতর্কতা বা সুনামি অ্যালার্ট জারি করা হয়েছিল। এই সতর্কতার কারণে সমুদ্র উপকূলের লাখ লাখ বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে আশার কথা হলো, ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টা পর সমুদ্র পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক হতে শুরু করায় বড় ধরনের কোনো সুনামি ছাড়াই সেই সতর্কতা পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করে নেয় সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক আবহাওয়া ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
ভূমিকম্পের তীব্র আঘাতের পর দুর্ঘটনাকবলিত এলাকাগুলো থেকে প্রকাশিত এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা ছবিতে একাধিক বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ার হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একাধিক শিউরে ওঠা ভিডিওতে দেখা গেছে, ফিলিপাইনের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বিখ্যাত জোলিবি ফাস্টফুড রেস্তোরাঁর একটি বড় শাখা ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনিতে সম্পূর্ণ ধসে পড়ে এক বিশাল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এছাড়া ভূমিকম্পের প্রভাবে পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত কয়েকটি এলাকায় বড় আকারের ভূমিধসের বা ল্যান্ডস্লাইডের ঘটনাও ঘটেছে, যার ফলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং উদ্ধারকাজে বিঘ্ন ঘটছে।
ফিলিপাইনের সরকারি সংস্থা সিভিল ডিফেন্স অফিসের সর্বশেষ হালনাগাদ করা সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া নিহত ৩৫ জনের মধ্যে ৩১ জনই মূলত সোকসারগেন অঞ্চলের বাসিন্দা এবং বাকি চারজন দাভাও অঞ্চলের বাসিন্দা বলে শনাক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা ফিলিপাইনের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও জনবহুল দ্বীপ মিন্দানাওয়ে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষের স্থায়ী বসবাস রয়েছে, যার কারণে ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতটা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। তবে ফিলিপাইনের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে যে, তারা এখনও উপদ্রুত এলাকাগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে এবং হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত সংখ্যাটি মাঠপর্যায়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করছে। নিখোঁজদের উদ্ধার এবং ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত ও হালনাগাদ আনুষ্ঠানিক তথ্য বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ করা হতে পারে।