মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে মানুষকে স্বস্তি দেওয়া, বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে আরও উৎপাদনমুখী ও বিকেন্দ্রীভূত করার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এ বাজেট বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়।
‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে প্রণীত এ বাজেটের আকার দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় এর আকার বেড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। এটি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারেরও প্রথম জাতীয় বাজেট। ফলে অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও বাজেটটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা কি খরচ করতে পারবেন অর্থমন্ত্রী? এই প্রশ্নের জবাব জানতে আমাদের একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে ৬ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। অর্থাৎ প্রস্তাবিত বাজেট ব্যয়ের মাত্র ৭৯ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। যদি গত কয়েক অর্থবছরে একটু পেছনে ফিরে তাকানো যায়, তাহলে দেখা যায় যে, বাজেট বাস্তবায়নের হার ৮০ শতাংশের ঘরেই আটকে আছে। সেই হিসেবে বলা যায়, এবারও হয়তো শেষ পর্যন্ত এমন ব্যয় হতে পারে।
রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য কি অর্জন হবে? এখানেই সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে থাকবেন আমাদের অর্থমন্ত্রী। নতুন বাজেটে তিনি রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরেছেন ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব বোর্ডের টার্গেট দিয়েছেন ৬ লাখ ৪... হাজার কোটি টাকা। যদিও চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল এই দশ মাসে রাজস্ব বোর্ড তার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ঘাটতিতে আছে। সেই হিসাবে আসছে অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে অন্তত ২ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় করতে হবে বলে মনে করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ)।
এত বড় ঘাটতি কীভাবে পূরণ হবে? ঘাটতি পূরণে দেশীয় উৎসের চেয়ে বিদেশী উৎসের দিকে বেশি নির্ভর করছেন অর্থমন্ত্রী। কারণ সংশোধিত বাজেটে বিদেশী ঋণ ধরা হয়েছে ৫৮,০০০ কোটি টাকা। এটা বাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ করে নতুন অর্থবছরের জন্য ১ লাখ ৯,৮৫০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় উৎস থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। যার মধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নিবেন ব্যাংক থেকে।
কিন্তু ব্যাংক থেকে কি এত ঋণ পাবেন অর্থমন্ত্রী? বর্তমানে ব্যাংকের যে ভঙ্গুর পরিস্থিতি এবং চলমান অস্থিরতা, তাতে এই ঋণ নেওয়াটা বেশ কঠিন হবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ব্যাংকগুলো বিপুল পরিমাণ খেলাফি ঋণে আক্রান্ত হয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার যেহেতু এবারে বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে, সেক্ষেত্রে বেসরকারি ক্ষেত্রে ঋণের চাহিদা বাড়তে পারে। তখন সরকারের বেশি ঋণ চাহিদা বিনিয়োগ ব্যাহত করবে।
তবে কি সরকার টাকা ছাপাবে? সম্ভাবনা একেবারে যে নেই, তা বলা যাবে না। কারণ এর আগে আমরা দেখেছি অন্তর্বর্তী সরকার টাকা ছাপিয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সহায়তা করেছে। তারও আগের সরকারের সময় বাজেট ঘাটতি মেটাতে টাকা ছাপানোর খবর এসেছিল বিভিন্ন গণমাধ্যমে। তবে বর্তমান অর্থমন্ত্রী অবশ্যই স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, টাকা ছাপানোর দিকে তিনি যাবেন না।
তাহলে কীভাবে মেটাবেন বিপুল এই ঘাটতি? দেশীয় এবং বিদেশী উৎসের ওপরই নির্ভরশীল হতে হবে। কোনো কারণে যদি প্রত্যাশা অনুযায়ী এই দুই খাত থেকে ঋণ না মেলে, তখন হয়তো বাজেট কাটছাঁট করতে হবে। আর এই কাটছাঁটের খড়্গটা নেমে আসে উন্নয়ন ব্যয়েই। কারণ পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আনা অতটা সহজ নয়; কারণ সেখানে সরকারি সুদ পরিশোধ ব্যয় থাকে, ভর্তুকির চাপ থাকে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে হয় এখানে বাকি রাখার কোনো সুযোগ নেই। তাইতো উন্নয়ন ব্যয় কাটছাঁট করা হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার ব্যয় পরিকল্পনা থাকলেও ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে তা ২ লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে।
নতুন বাজেটে এত কর ছাড় কেন? স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইলসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স পণ্যের উৎপাদনে কর ছাড়ের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এছাড়াও নিত্যপণ্যসহ আরও অনেক খাতে করছাড় দেওয়া হয়েছে। এর ফলে কী হবে? এসব পণ্যের বিক্রি বাড়বে, তাতে করে ভোগ ব্যয় বাড়বে। আর সেই ভোগ ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করেই এবার অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনতে চান অর্থমন্ত্রী।