রায়ের বিস্তারিত ও আদালতের পর্যবেক্ষণ আদালত রায়ে আসামি আবিরকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড ছাড়াও ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেছেন। জরিমানার এই অর্থ অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া লাশ গুম করার অপরাধে আসামিকে পৃথকভাবে আরও ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জরিমানার এই টাকা ভুক্তভোগী আয়াতের পরিবারকে প্রদানের জন্য আদালত স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন।
রায় ঘোষণার সময় বিচারক তার পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড ছিল না; বরং এটি ছিল একটি পূর্বপরিকল্পিত, নিষ্ঠুর, নৃশংস এবং নির্মম অপরাধ, যা পুরো সমাজে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। আয়াতের মতো একটি নিষ্পাপ শিশুকে মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করে যেভাবে হত্যা ও লাশ গুম করা হয়েছে, তা মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল।
ঘটনার পটভূমি: সেই বিভীষিকাময় দিন ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরের ইপিজেড থানার বন্দরটিলা এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানার ৫ বছর বয়সী মেয়ে আলিনা ইসলাম আয়াত নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। দীর্ঘ সময় আয়াতের কোনো খোঁজ না পাওয়ায় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
পিবিআইয়ের গভীর তদন্তে বের হয়ে আসে এক লোমহর্ষক তথ্য। তাদের তদন্তে জানা যায়, আয়াতের পরিবারের বাসায় ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকা মো. আবিরই এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী। ২৫ নভেম্বর আবিরকে গ্রেপ্তারের পর তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন।
হত্যার নেপথ্যে নির্মমতা পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুক্তিপণ আদায়ের লক্ষ্যেই আয়াতকে অপহরণ করা হয়েছিল। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী মুক্তিপণ পাওয়ার আগেই পরিস্থিতি অন্যরকম হয়ে যাওয়ায় আবির আয়াতকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। হত্যার পর অপরাধ লুকানোর জন্য শিশুটির দেহ ৬ টুকরা করা হয়। পরে অত্যন্ত কৌশলে সেই মরদেহের খণ্ডাংশগুলো বস্তাবন্দী করে সাগরপাড় ও খালের পাশে ফেলে দেওয়া হয়, যা শুনে বিবেকবান মানুষ শিউরে উঠেছিল।
২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর মামলার তদন্ত শেষে পিবিআইয়ের তৎকালীন পরিদর্শক মুস্তাফিজুর রহমান আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। এতে আবির ও তার এক ১৭ বছর বয়সী কিশোর বন্ধুর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। কিশোর অপরাধী হওয়ায় তার বিচার শিশু আদালতে বর্তমানে চলমান রয়েছে।
বিচারপ্রার্থীর অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়া আদালতের রায় ঘোষণার পর আয়াতের বাবা সোহেল রানা গণমাধ্যমকে জানান, ‘আমি এই রায়ে সন্তুষ্ট। তবে আমাদের একটাই চাওয়া, আসামির মৃত্যুদণ্ড যেন অতি দ্রুত কার্যকর হয়। বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সাহস পায়। আমরা চাই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন চিরতরে বন্ধ হয়।’
রায় ঘোষণার আগে আদালত চত্বরে আয়াতের স্বজনদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। হাতে ব্যানার নিয়ে আসামির সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে তাদের সরব উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। জনমনে আশা, এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো, যা সমাজে অপরাধ দমনে একটি বড় বার্তা হিসেবে কাজ করবে।
আকাশজমিন / আরআর