“মুখ বন্ধ করো! তুমি...”—চরম উত্তেজনার মুহূর্তে এমন অনেক ইংরেজি বাক্য বা শব্দ হঠাৎ করেই অনেকের মুখ দিয়ে অনর্গল বেরিয়ে আসে। অথচ দেখা যায়, তীব্র মানসিক আঘাত, গভীর দুঃখ কিংবা পরম আনন্দের মতো নিখাদ অনুভূতির মুহূর্তে সেই মানুষটিই আবার নিজের চেনা মাতৃভাষায় ফিরে যান। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি অত্যন্ত অদ্ভুত এবং অনেকের কাছে এটি এক ধরণের দেখনদারি মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে মানুষের জটিল মস্তিষ্ক ও মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতির এক গভীর বিজ্ঞানসম্মত সম্পর্ক। বিশিষ্ট মনোবিদদের মতে, একজন মানুষ কোন সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোন ভাষাটি বেছে নিয়ে কথা বলবে, তা মূলত নির্ভর করে তার মস্তিষ্কের গঠন, দীর্ঘদিনের অবচেতন অভ্যাস এবং শৈশব থেকে বেড়ে ওঠার সামাজিক পরিবেশের ওপর।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শৈশব থেকে মানুষ যে ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত হয়, সেটি তার হৃদয়ের একদম কাছাকাছি থাকে এবং মানুষের প্রাথমিক আবেগের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। অন্যদিকে, ইংরেজি বা যেকোনো বিদেশি ভাষা মানুষ সাধারণত একটু বড় হয়ে কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে শেখে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা করপোরেট কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত ব্যবহারের কারণে এই দ্বিতীয় ভাষার সাথে মানুষের মনের এক ধরণের কৃত্রিম দূরত্ব বা সূক্ষ্ম মানসিক ব্যবধান তৈরি হয়। প্রচণ্ড রাগের চরম মুহূর্তে এই মানসিক দূরত্বটিই একজন মানুষের জন্য এক ধরণের ঢাল বা আত্মরক্ষামূলক কৌশল হিসেবে কাজ করে। রাগের মাথায় মানুষ যখন নিজের মনের দুর্বল বা নাজুক অনুভূতিগুলো সরাসরি প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করে, তখন অন্য ভাষার আশ্রয় নিলে অবচেতনভাবেই নিজের মনের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।
মাতৃভাষার সাথে মানুষের আজন্ম নাড়ির সম্পর্ক তৈরি হয় একদম শৈশবকাল থেকে। মায়ের মুখের মিষ্টি কথা, বাবার স্নেহমাখা শাসন, পরিবারের ভালোবাসা আর শৈশবের অমলিন স্মৃতি—সবকিছুর সাথেই জড়িয়ে থাকে নিজের চেনা মুখের ভাষা। ফলে মানুষ যখন অতিরিক্ত আনন্দিত হয়, তীব্র মানসিক কষ্ট পায় কিংবা তীব্র আবেগে ভেসে যায়, তখন সে অবচেতনভাবেই নিজের সবচেয়ে চেনা ও সহজ ভাষার আশ্রয় নেয়। কারণ চরম আবেগের সেই মুহূর্তগুলোতে মানুষের জটিল মস্তিষ্ক অনেক সময় যুক্তির চেয়ে মানুষের সহজাত অনুভূতিকে অনেক বেশি প্রাধান্য দেয়।
তবে বিশেষজ্ঞরা এও বলছেন যে, যারা একাধিক ভাষায় কথা বলতে পারদর্শী, তাদের ক্ষেত্রে রাগের সময় বিদেশি ভাষা ব্যবহার করা এক ধরণের দারুণ মানসিক থেরাপি বা কৌশল হিসেবেও কাজ করতে পারে। যেহেতু অন্য ভাষায় কথা বলার সময় মানুষের মস্তিষ্ককে সঠিক শব্দ এবং সঠিক ব্যাকরণ বেছে নিতে সামান্য বেশি ভাবতে হয়, তাই এই ক্ষণিকের চিন্তাভাবনা বা সূক্ষ্ম বিরতিই অনেক সময় রাগের তীব্রতাকে অনেকাংশে কমিয়ে আনতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। প্রকৃতপক্ষে, মানুষের জীবনে বিদেশি বা দ্বিতীয় ভাষাটি অনেক সময় হয়ে ওঠে তার বাহ্যিক চিন্তা ও পেশাদারী প্রকাশের প্রধান মাধ্যম, আর নিজের মাতৃভাষাটি চিরকালই থেকে যায় তার অন্তরের অন্তঃস্থলের হৃদয়ের ভাষা। মানুষ বাহ্যিকভাবে যতই আধুনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হোক না কেন, জীবনের চরম ও গভীর আবেগের মুহূর্তে সে সবসময় নিজের চিরচেনা শিকড়ের কাছেই ফিরে যায়। এটি কেবল দু-একজনের গল্প নয়, বরং বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মনের এক স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতারই বহিঃপ্রকাশ।