বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সই হওয়া পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি (এআরটি) দেশের অর্থনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ চুক্তির ফলে স্বল্পমেয়াদে কিছু শিল্প খাতের কাঁচামাল আমদানিতে সুবিধা মিললেও, দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় কৃষক, খামারি ও কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারেন। বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তা ও সামগ্রিক কৃষিনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত অনুযায়ী, প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলারের কৃষিপণ্য কেনা বাধ্যতামূলক। যার মধ্যে রয়েছে ৭ লাখ টন গম, ২৬ লাখ টন সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য, তুলা, ভুট্টা এবং পশুখাদ্য। এতদিন বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে বিভিন্ন দেশ থেকে এসব পণ্য কিনত। এখন নির্দিষ্ট উৎস থেকে এই বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানির বাধ্যবাধকতা দেশের স্বাধীন আমদানি নীতিকে সংকুচিত করবে।
বাংলাদেশের দেড় কোটিরও বেশি প্রান্তিক কৃষক যেখানে সীমিত পুঁজি নিয়ে উৎপাদন করেন, সেখানে মার্কিন কৃষি খাত বিপুল সরকারি ভর্তুকি ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর। স্বাভাবিকভাবেই মার্কিন পণ্যের উৎপাদন খরচ কম। ফলে শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কে এসব পণ্য দেশের বাজারে ঢুকলে স্থানীয় চাষিরা মূল্য প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন না। বিশেষ করে পোলট্রি ও মৎস্য খাদ্যের জন্য দেশে যে ভুট্টার চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে, তা সস্তা আমদানির বন্যায় বড় ধাক্কা খাবে। সেন্ট্রাল ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, এই চুক্তি দেশের অর্থনৈতিক ও নীতিগত স্বাধীনতাকে ক্ষুন্ন করতে পারে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা ও এলডিসি উত্তরণের বিষয়গুলো মাথায় রেখে চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি।
এদিকে পশুখাদ্যের কাঁচামাল সহজলভ্য হলে পোলট্রি ও ডেইরি খাত কিছুটা উপকৃত হতে পারে। তবে দেশীয় উৎপাদন ব্যাহত হলে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা বাড়বে, যা বৈশ্বিক সংকটের সময় খাদ্য নিরাপত্তাকে বিপন্ন করবে। এছাড়া চুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) মানদণ্ডকে স্বীকৃতি দিতে হবে, যা দেশে বিতর্কিত জেনেটিক্যালি মডিফায়েড (জিএম) ফসলের প্রবেশ সহজ করতে পারে। শক্তিশালী মার্কিন কোম্পানির অবাধ প্রবেশে হুমকিতে পড়বে বিকাশমান দেশীয় ভোজ্যতেল, বীজ ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পও।
তবে তৈরি পোশাক খাতের জন্য তুলা আমদানি সহজ হওয়া এবং উন্নত মার্কিন কৃষি প্রযুক্তির ভাগ পাওয়ার মতো কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। কিন্তু দেশের ৪০ শতাংশ মানুষের জীবিকা যেখানে কৃষির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে সুরক্ষামূলক নীতি না থাকলে সুবিধার চেয়ে বিপর্যয়ই বেশি ঘটবে। সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এ প্রসঙ্গে সতর্ক করে বলেন, মার্কিন মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য সহজে দেশে এলে গরুর-ছাগল পালনের সাথে জড়িত প্রায় দুই কোটি মানুষ অসম প্রতিযোগিতায় পড়বে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগারের সনদকে চূড়ান্ত মানলে আমদানিকৃত প্রাণিজ পণ্যের মাধ্যমে বিপজ্জনক জুনোটিক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকিও থেকে যায়। তাই জাতীয় স্বার্থ ও স্থানীয় খামারিদের সুরক্ষা দিয়েই এই বাণিজ্যচুক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।