ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের ঝুঁকি এড়াতে কাস্পিয়ান সাগরকে কেন্দ্র করে একটি নতুন কৌশলগত নৌ-পরিবহন ও স্থল রুটে বড় ধরনের বিনিয়োগ সম্পন্ন করেছে চীন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈরী হয়ে ওঠা রাশিয়া এবং চলমান সংঘাতপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলগুলোকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে সরাসরি ইউরোপের বাজারে পণ্য আমদানি-রপ্তানি সচল রাখতেই বেইজিংয়ের এমন দূরদর্শী উদ্যোগ।
হংকংভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে ৪ হাজার ৭৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বিশেষ ‘মিডল করিডোর’ নির্মাণের জন্য শত শত মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক রুটটি মূলত চীন থেকে শুরু হয়ে কাজাখস্তান পার হবে এবং এরপর কাস্পিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে আজারবাইজানে পৌঁছাবে। সেখান থেকে জর্জিয়া হয়ে তুরস্কের স্থলভাগের মধ্য দিয়ে এটি সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মূল বাজারে প্রবেশ করবে।
জর্জিয়াভিত্তিক আন্তঃসরকার কর্মসূচি ‘ট্রান্সপোর্ট করিডোর ইউরোপ-ককেশাস-এশিয়া’ (TRACECA)-র সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, কাস্পিয়ান সাগরের আজারবাইজান অংশে অবস্থিত বাকু বন্দরের আধুনিকায়নের জন্য চীন প্রায় ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অনুদান সহায়তা এবং আরও প্রায় ২ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ভারী যন্ত্রপাতি প্রদান করেছে। এর পাশাপাশি, সাগরের অপর প্রান্তে কাজাখস্তানের আকতাউ অঞ্চলে নির্মীয়মাণ নতুন সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের বিশাল অবকাঠামোর সঙ্গেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি যুক্ত হয়েছে।
কৌশলগত এই করিডোরটি বৈশ্বিক বাণিজ্য মহলে ‘ট্রান্স-কাস্পিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট রুট’ নামেও পরিচিত। এর বিশাল নেটওয়ার্কের মধ্যে সমুদ্রবন্দরের পাশাপাশি সড়ক ও রেল যোগাযোগও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তুরস্কের একটি উচ্চপদস্থ কূটনৈতিক সূত্র সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে নিশ্চিত করেছে যে, এই করিডোরটি পুরোপুরি সচল করা সম্ভব হলে চীন থেকে একটি বিশাল কার্গো চালান মাত্র ১৫ থেকে ১৮ দিনের মধ্যে সরাসরি ইউরোপের বন্দরে পৌঁছানো সম্ভব। যেখানে দক্ষিণ এশিয়া ও সুয়েজ খালের প্রচলিত সমুদ্র রুটগুলো ব্যবহার করলে সাধারণত দীর্ঘ ৪৫ থেকে ৬০ দিন সময় লেগে যায়। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) চীন থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ পণ্য আমদানি করে থাকে।
অবশ্য নিউইয়র্কের বার্নার্ড কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আলেকজান্ডার কুলির মতে, প্রচলিত উন্মুক্ত সমুদ্রপথের তুলনায় এই করিডোরটির পণ্য পরিবহন সক্ষমতা (ক্যাপাসিটি) এখনো বেশ কম এবং প্রতি ইউনিট পণ্য পরিবহনের খরচও তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি। এছাড়া, কাস্পিয়ান সাগর পারাপার, বিভিন্ন দেশের বন্দরগুলোর আধুনিকীকরণ এবং আন্তঃদেশীয় রেললাইনের গেজ পরিবর্তনের মতো কারিগরি জটিলতাগুলো নিরসনে এখনও অনেক কাজ বাকি আছে। তবে আলেকজান্ডার কুলি এটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এই করিডোরের সামগ্রিক মানোন্নয়ন ও অবকাঠামোগত ত্রুটি দূর করার মতো প্রয়োজনীয় বিপুল পুঁজি ও উচ্চ কারিগরি দক্ষতা—উভয়ই বেইজিংয়ের আছে।
বর্তমানে চীন থেকে রাশিয়া হয়ে ইউরোপ সংযোগকারী যে ঐতিহ্যবাহী স্থল রুটটি রয়েছে, তা প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এই রুটটি ব্যবহারকারী মালবাহী পরিবহনগুলো যেকোনো সময় পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ার তীব্র ঝুঁকিতে আছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক চরম সংঘাত এবং আফ্রিকা উপকূলে লোহিত সাগরে জলদস্যুদের উপদ্রব প্রচলিত সমুদ্র রুটগুলোর বাণিজ্যিক ঝুঁকি ও বিমার খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সব বৈশ্বিক সংকটের বিপরীতে চীনের তৈরি এই নতুন করিডোরটি ভূ-রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ ও নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।