দীর্ঘ প্রায় ৩৭ বছর ধরে ইরানের শাসনক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ৮৬ বছর বয়সে নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় তার এই আকস্মিক মৃত্যু ইরান তথা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। তার দাফন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড মোসাল্লাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে উড়ানো হয়েছে বিশেষ লাল পতাকা, যা শিয়া মুসলিম সংস্কৃতির ঐতিহ্য অনুযায়ী রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
পুরো শোকানুষ্ঠানজুড়ে ‘আমাদের জেগে উঠতেই হবে’ স্লোগানটি বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি তেহরানের কেন্দ্রস্থলে খামেনির একটি মুষ্টিবদ্ধ হাতের বিশাল প্রতিকৃতি প্রদর্শন করা হয়েছে, যা দেশটির প্রতিরোধ আন্দোলনের শক্তির প্রতীক। নিহত নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শনিবার ভোররাত থেকেই হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও সরকারি সমর্থকরা গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে জড়ো হতে শুরু করেন। তীব্র আবেগ ও ক্ষোভের মিশেলে উত্তাল হয়ে উঠেছে পুরো রাজধানী।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোতে প্রচারিত বিভিন্ন ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, রাজধানীর একাধিক মেট্রো স্টেশনসহ শোক মিছিলে অংশ নেওয়া সাধারণ জনতা সমস্বরে ‘আমেরিকার ধ্বংস হোক’ এবং ‘ইসরায়েলের ধ্বংস হোক’ বলে তীব্র ক্ষোভের সাথে স্লোগান দিচ্ছেন। এই বিশাল জমায়েত ও সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচিকে ঘিরে পুরো তেহরান জুড়ে নজিরবিহীন ও কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে অনুষ্ঠানস্থলের চারপাশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ভারী মেশিনগান, সাঁজোয়া যান এবং দক্ষ স্নাইপার দল মোতায়েন করা হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই জোরদার করা হয়েছে যে, মোসাল্লায় প্রবেশকারী প্রতিটি পুরুষকে কঠোরভাবে দেহ তল্লাশি করা হচ্ছে। নিরাপত্তার স্বার্থে আগত ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়ার ব্যাংক, শ্রবণ সহায়ক যন্ত্র (হেয়ারিং ডিভাইস) এবং আগুন জ্বালানোর মতো যেকোনো ধরনের দাহ্য পদার্থ জব্দ করছেন নিরাপত্তাকর্মীরা। দেশটির রাষ্ট্র-সমর্থিত বিভিন্ন সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সর্বোচ্চ নেতার এই হত্যাকাণ্ড ইসলামী প্রজাতন্ত্র সরকারের সমর্থকদের আগের চেয়ে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ ও উজ্জীবিত করেছে। উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে তৎকালীন শাহ মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভীকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে এই প্রশাসন ইরান শাসন করে আসছে।
ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৯৮৯ সালে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজায় যেভাবে ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম মানবসমুদ্রের সৃষ্টি হয়েছিল, খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানও ঠিক একই রকম জনসমুদ্রে রূপ নিতে যাচ্ছে। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, খোমেনির সেই ঐতিহাসিক জানাজার ভিড়ে পদদলিত হয়ে অন্তত আটজন ভক্তের মৃত্যু হয়েছিল এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেষ পর্যন্ত সামরিক বাহিনীকে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে মরদেহ সরিয়ে নিতে হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে এবং গ্রীষ্মকালীন তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে আগতদের তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যগত সহায়তা দিতে পুরো এলাকাজুড়ে জরুরি চিকিৎসাসেবা ও মেডিকেল টিম মোতায়েন করা হয়েছে। অবশ্য এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা বড় চিকিৎসাসংক্রান্ত জরুরি অবস্থার খবর পাওয়া যায়নি। তবে জানাজাকে কেন্দ্র করে তেহরানের বিস্তীর্ণ এলাকা ব্যারিকেড দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে এবং সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে সব ধরনের বেসরকারি যানবাহনের প্রবেশ ও প্রস্থান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।