ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

চোখের জলে ক্ষোভের আগুন, খামেনির বিদায়পর্বে কাঁপছে তেহরান


  • আপলোড সময় : সোমবার ০৬ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৮:৫৫ এএম

ইরানের রাজধানী তেহরানের বুকজুড়ে আজ শুধুই কান্নার রোল, আর সেই কান্নার গভীরেই লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর প্রতিশোধের লাভা। কোটি কোটি মানুষের উপচে পড়া সমাগমে চলছে বিনম্র শ্রদ্ধা আর ইসরায়েল-আমেরিকা বিরোধী তীব্র হুংকারে ঘেরা এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন বিদায়পর্ব। তেহরানের ঐতিহ্যবাহী গ্র্যান্ড ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান শুরু হতেই চারপাশ থেকে ছুটে আসে শোকাহত মানুষের এক বিশাল সমুদ্র। আলো ফোটার অনেক আগেই, রাতের আঁধার কেটে ভোর হওয়ার পূর্বেই ইরানের প্রত্যন্ত ও বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ এসে জড়ো হতে থাকেন বিশাল এই ধর্মীয় কমপ্লেক্সের চত্বরে। পরিবার-পরিজন, আলেম-ওলামা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় নেতা এবং সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ— নারী থেকে শুরু করে শুভ্রকেশী প্রবীণ, সবার গন্তব্য আজ ছিল কেবল একটিই বিন্দুতে। শোকাকুল সেই জনতার অনেকের হাতেই ছিল ইরানের জাতীয় পতাকাসহ আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতিকৃতি, পবিত্র কোরআন মাজিদ এবং কালো রঙের শোকের পতাকা। ইরানিদের কাছে এটি কেবল একজন সাধারণ রাষ্ট্রনেতার জানাজা বা শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এমন এক মহান নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর অন্তিম মুহূর্ত, যাকে তারা মনেপ্রাণে ইসলামী বিপ্লবের অতন্দ্র রক্ষক এবং পশ্চিমা ও বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে আপসহীন প্রতিরোধের এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবে দেখেন।

এই ঐতিহাসিক শোকানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পুরো তেহরান নগরী যেন আজ এক কালো শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। সমস্ত সরকারি ভবন, বড় বড় ঐতিহাসিক মসজিদ ও প্রধান প্রধান জনসমাগমস্থলে পতপত করে উড়তে দেখা গেছে শোকের কালো পতাকা। রাজধানীর প্রধান ও ব্যস্ততম সড়কগুলোর মোড়ে মোড়ে টানানো বিশাল সব ব্যানারে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে আয়াতুল্লাহ খামেনির শাহাদাতবরণের কথা, যেখানে ইরানের সমকালীন ইতিহাস ও অর্থনীতি গঠনে তাঁর অসামান্য অবদানের প্রশংসা করা হয়। শহরের বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে লাউডস্পিকারে দিনভর বাজছিল পবিত্র কোরআনের হৃদয়স্পর্শী তেলাওয়াত, গভীর শোকসংগীত ও ঐতিহাসিক বিপ্লবী গান, যা পুরো পারস্য নগরীতে এক অভূতপূর্ব ও গম্ভীর শোকাবহ আবহ তৈরি করে রেখেছে। তবে মোসাল্লার ভেতরে ও বাইরে সমবেত হওয়া শোকাহত মানুষের হাতে কালো পতাকার পাশাপাশি শোভা পাচ্ছিল এক টুকরো লাল পতাকা— যা পারস্যের সংস্কৃতিতে শহীদদের পবিত্র রক্তের চরম প্রতিশোধের এক অকাট্য প্রতীক হিসেবে সুপরিচিত। অশ্রুভেজা চোখেও জনতার কণ্ঠে মুহুর্মুহু উঠতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী চরম ক্ষোভের স্লোগান। ‘আমেরিকা ধ্বংস হোক’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’— এমন অগ্নিগর্ভ স্লোগানে বারবার প্রকম্পিত হয়ে ওঠে মূল শোকমঞ্চের চারপাশ। সমবেত লাখো মানুষের চোখে জল ঝরলেও, সেই কান্নার ভেতরেই অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠছিল এক ভয়াবহ প্রতিশোধের আগুন।

মোসাল্লার মূল নামাজকক্ষের ঠিক মাঝখানে কাচঘেরা একটি সুরক্ষিত স্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাখা হয় আয়াতুল্লাহ খামেনির নিথর মরদেহ। একই সঙ্গে সেখানে রাখা হয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই নৃশংস ও কাপুরুষোচিত হামলায় নিহত তাঁর পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যের মরদেহও। শোকের সাগরে ভাসতে থাকা মানুষ একে একে সেই কাচঘেরা মঞ্চের পাশে গিয়ে তাঁদের প্রিয় নেতাকে জীবনের শেষ শ্রদ্ধা জানান। সেখানে গিয়ে কেউ নীরবে মোনাজাত করেন, কেউ পবিত্র কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করে মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন, আবার কেউ কেউ অশ্রুসজল চোখে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন দীর্ঘক্ষণ। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রোববার পর্যন্ত গ্র্যান্ড ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় খামেনির মরদেহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। এরপর সোমবার সপ্তাহের প্রথম দিনে তেহরানের রাজপথে শুরু হবে তাঁর আনুষ্ঠানিক শেষযাত্রা। তাঁর শিয়রে রাখা হয়েছে প্রিয় স্বজনদের মরদেহও— যাদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর জামাতা ড. মেসবাহ আল-হোদা বাঘেরি কানী, বড় মেয়ে সাইয়্যেদেহ বশরা হোসেইনি খামেনি, মাত্র ১৪ মাস বয়সী অবুঝ নাতনি জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়েগানি এবং পরম স্নেহময়ী পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ আদেল। ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই কালরাত এক নিমিষেই কেড়ে নিয়েছে ইরানের এই প্রথম পরিবারকে।

ইরানের লাখো-কোটি মানুষের কাছে এই শোকানুষ্ঠান কেবল একজন সর্বোচ্চ শাসককে বিদায় জানানোর কোনো রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি এমন এক বিশ্বনেতার প্রতি জাতির অন্তহীন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, যাকে তারা বিশ্বাস করেন সারাজীবন ইরানের স্বাধীনতা রক্ষা, ইসলামী বিপ্লবের মূল আদর্শকে টিকিয়ে রাখা এবং মুসলিম বিশ্বের নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষের পক্ষে আজীবন সংগ্রাম করা এক মহান ও অপরাজেয় বিপ্লবী নেতা হিসেবে। ইরানি জনগণের দৃঢ় বিশ্বাস, আয়াতুল্লাহ খামেনির এই শাহাদাতবরণ কোনোভাবেই তাঁর আদর্শ ও প্রভাবের সমাপ্তি ঘটাতে পারবে না; বরং এটি তাঁর রেখে যাওয়া প্রতিরোধের উত্তরাধিকারের এক নতুন ও শক্তিশালী অধ্যায়ের সূচনা মাত্র। শুধু ইরানের সীমানার ভেতরেই নয়, বরং খামেনির আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ছিল গোটা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত। সমগ্র মুসলিম বিশ্বের প্রগতিশীল ও স্বাধীনতাকামী মানুষের কাছে তিনি ছিলেন বিদেশি ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবিরোধী প্রতিরোধের এক অতি জোরালো ও সাহসী কণ্ঠস্বর। তিনি তাঁর বিভিন্ন ঐতিহাসিক ভাষণে বারবার জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘প্রকৃত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করা তখনই সম্ভব, যখন বিশ্বের জাতিগুলো নিজেদের মানুষ, নিজেদের ঐতিহ্য, নিজেদের জ্ঞান, নিজেদের সংস্কৃতি ও নিজেদের জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর শতভাগ আস্থা ও বিশ্বাস রাখবে।’ আর এই কারণেই তেহরানের শোকমঞ্চে জমায়েত হওয়া কোটি মানুষের চোখে আজ নোনা জল থাকলেও, সেই অশ্রুর ভেতরেই লুকিয়ে ছিল অনাগত ভবিষ্যতের আরেকটি কঠিন অঙ্গীকার— তাদের বিশ্বাসের পরম নেতা ইহকাল ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর দেখানো পথ, তাঁর শেখানো প্রতিরোধের অবিনাশী ভাষা এবং তাঁর রেখে যাওয়া জাদুকরী উত্তরাধিকার তারা পরম যত্নে বয়ে নিয়ে যাবে আগামী প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

আকাশজমিন/ আরআর  


এ সম্পর্কিত আরো খবর