বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইনি লড়াইয়ের চূড়ান্ত অবসান ঘটল। দেশের নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তিসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা বেশ কিছু সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া ঐতিহাসিক রায়টি বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে রিটকারীদের দায়ের করা আপিল আবেদন আজ খারিজ করে দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত। এর ফলে দেশের সংবিধানে আনুষ্ঠানিকভাবে এবং স্থায়ীভাবে পুনরুজ্জীবিত হলো বহু প্রতীক্ষিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এবং জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতের প্রতিফলন ঘটানো ‘গণভোটের’ বিধান।
আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকাল সাড়ে ৯টায় দেশের প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে চার বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত আপিল বেঞ্চ এই যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। মূল রিট আবেদনকারীদের পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনা করেন ড. শরীফ ভূঁইয়া এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। রায়ের পর এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া এবং অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আজ সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছেন তা বাংলাদেশের আইনি ও গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থাকবে। এর আগে টানা তিন দিন ব্যাপী দীর্ঘ ও নিবিড় শুনানি শেষে গতকাল বুধবার (৮ জুলাই) আপিল বিভাগ রায়ের জন্য আজকের দিনটি ধার্য করেছিলেন।
এই মামলার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের বেশ কয়েকটি ধারাকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করে রায় দিয়েছিলেন। সেই রায়ে আদালত স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন যে, গণতন্ত্র হচ্ছে আমাদের সংবিধানের মূল কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই গণতন্ত্র বিকশিত হয় অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং বাহ্যিক প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে দেশের সাধারণ মানুষের ইচ্ছার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। দলীয় সরকারের অধীনে একটি গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব, এমন আত্মবিশ্বাস ও আস্থা জনগণের মনে তৈরি হয়নি; যার চূড়ান্ত ফলশ্রুতি হিসেবে দেশে সংঘটিত হয়েছে রক্তক্ষয়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থান। হাইকোর্ট আরও বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মূলত জনগণের সামগ্রিক অভিপ্রায় অনুযায়ী সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ। সেই সময় হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদসহ ৭ক, 7খ এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদকে বাতিল ঘোষণা করেন। তবে ওই রায়ে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা হয়নি; বরং জাতির পিতার স্বীকৃতি এবং ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণার মতো বিষয়গুলো অক্ষুণ্ণ রেখে বাকি ধারাগুলো আইন অনুসারে সংশোধন বা পরিমার্জনের দায়িত্ব আগামী জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। একই সাথে দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের মাধ্যমে সংবিধানে গণভোটের প্রথা ফিরিয়ে আনা হয়।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা হয়েছিল। এই সংশোধনীর মাধ্যমেই দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয় এবং সংবিধানে ব্যাপকভাবে ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন আনা হয়েছিল। পরবর্তীতে গত বছরের ১৯ আগস্ট সুজনের (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের দায়ের করা একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে তৎকালীন বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকারের বেঞ্চ পঞ্চদশ সংশোধনী কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।
পরবর্তীতে এই রুলে পক্ষভুক্ত বা ইন্টারভেনর হিসেবে যুক্ত হন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, ইনসানিয়াত বিপ্লব ও গণফোরামসহ বেশ কয়েকজন আবেদনকারী। গত বছরের ৩ নভেম্বর বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল দায়ের করে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবি জানান। ১৩ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হকের উপস্থিতিতে আপিলের অনুমতি দেন। অবশেষে আজ সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্টের সিদ্ধান্তই পূর্ণাঙ্গভাবে বহাল রইল।