ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান

চলনবিলে বর্ষার আগমনে নৌকা তৈরির ধুম, ব্যস্ত কারিগররা


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ০৯ জুলাই, ২০২৬ সময় : ৫:১০ পিএম

বর্ষার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের অন্যতম বৃহৎ জলাভূমি চলনবিলে শুরু হয়েছে নৌকা তৈরির ব্যস্ততা। বর্ষা মৌসুমে বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এখানকার মানুষের চলাচল, জীবিকা এবং দৈনন্দিন জীবন পুরোপুরি নির্ভর করে নৌকার ওপর। তাই বর্ষা শুরুর আগেই নতুন নৌকা তৈরি এবং পুরোনো নৌকা মেরামতের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন এলাকার কারিগররা। বছরের অন্য সময় তুলনামূলক কর্মহীন থাকলেও এই মৌসুমই তাদের প্রধান আয়ের সময়।

চলনবিল অঞ্চলে বহু পুরোনো একটি প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে— ‘বছরে ১২ মাসের ৪ মাস নায়ে, আর ৮ মাস পায়ে।’ এই প্রবাদই তুলে ধরে বিলাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্র। শুষ্ক মৌসুমে মানুষ পায়ে হেঁটে চলাচল করলেও বর্ষাকালে প্রায় চার মাস নৌকাই হয়ে ওঠে তাদের একমাত্র ভরসা।

জানা গেছে, চলনবিলের চাটমোহর, গুরুদাসপুর, তাড়াশ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর ও আত্রাই উপজেলার অধিকাংশ গ্রামের মানুষ বর্ষা মৌসুমে দীর্ঘ সময় পানিবন্দি অবস্থায় থাকেন। গ্রাম থেকে হাট-বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র কিংবা কর্মস্থলে যাতায়াত—সব ক্ষেত্রেই নৌকাই একমাত্র পরিবহন। ফলে বর্ষার আগে নৌকার চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

সম্প্রতি চলনবিলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কাঠ কাটা, নৌকার কাঠামো তৈরি, পাটাতন বসানো, রং করা এবং পুরোনো নৌকার বিভিন্ন অংশ মেরামতের কাজে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিরলসভাবে কাজ করছেন কারিগররা। সময়মতো ক্রেতাদের হাতে নৌকা তুলে দিতে তাদের অনেককেই অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হচ্ছে।

তাড়াশের নৌকা তৈরির কারিগর কৃষ্ণ জানান, চলনবিল এলাকায় সাধারণত তিন ধরনের নৌকা তৈরি হয়। এগুলো হলো শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকা, ডিঙ্গি নৌকা এবং বাইচের নৌকা। এর মধ্যে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত বড় নৌকা তৈরি করতে সাধারণত ১ লাখ থেকে ২ লাখ টাকা ব্যয় হয়। নৌকার আকার ও কাঠের মান অনুযায়ী ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, ছোট ডিঙ্গি নৌকার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে ৯ হাত ও ১০ হাত দৈর্ঘ্যের নৌকা বেশি বিক্রি হয়। ৯ হাতের একটি নৌকার দাম প্রায় ৪ হাজার টাকা এবং ১০ হাতের একটি নৌকার দাম প্রায় ৫ হাজার টাকা। এসব নৌকা মূলত মাছ ধরা, স্বল্প দূরত্বে যাতায়াত এবং পারিবারিক কাজে ব্যবহার করা হয়।

অন্যদিকে মালবাহী ও যাত্রীবাহী শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকারও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বর্ষাকালে কৃষিপণ্য পরিবহন, বাজারে যাতায়াত এবং বিভিন্ন এলাকায় যাত্রী পরিবহনে এসব নৌকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি বিভিন্ন উৎসব ও প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে বাইচের নৌকাও তৈরি করছেন কারিগররা।

নওগাঁ হাটে নৌকা কিনতে আসা পিন্টু আলী বলেন, “আমাদের গ্রামটি চলনবিলের মাঝখানে। সামান্য বর্ষাতেই রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যায়। তখন নৌকা ছাড়া চলাচলের কোনো উপায় থাকে না। বন্যার পানি খাল-বিলে ঢুকতে শুরু করেছে, তাই আগেভাগেই নৌকা কিনতে এসেছি। তবে এ বছর নৌকার দাম আগের তুলনায় কিছুটা বেশি।”


চলনবিলের মধ্যস্থলে অবস্থিত লালুয়ামাঝিরা গ্রামের মাঝি মো. ফি‌লিপ জানান, বড় শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকা তৈরি করতে ১ লাখ থেকে ২ লাখ টাকা, কখনো তারও বেশি খরচ হয়। ফলে অনেকের ইচ্ছা থাকলেও আর্থিক সংকটের কারণে নিজের নৌকা তৈরি করা সম্ভব হয় না। তারা অন্যের নৌকা চুক্তিভিত্তিক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।

তিনি আরও বলেন, বর্ষা মৌসুমে নৌকাই তাদের প্রধান উপার্জনের মাধ্যম। যাত্রী পরিবহন, কৃষিপণ্য বহন, মাছ ধরা এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজে নৌকার ব্যবহার বাড়ে। এই কয়েক মাসের আয়ের ওপরই অনেক পরিবারের বছরের বড় একটি অংশ নির্ভর করে।

নৌকা তৈরি কারিগর দুলাল হোসেন বলেন, বছরের অধিকাংশ সময় কাজের তেমন সুযোগ থাকে না। বর্ষা মৌসুমের তিন থেকে চার মাসই তাদের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। কিন্তু আগের মতো ভালো মানের কাঠ সহজে পাওয়া যায় না। যে কাঠ পাওয়া যায়, তার দামও অনেক বেড়ে গেছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও লাভের পরিমাণ আগের তুলনায় কমে গেছে।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “অন্য কোনো পেশায় যেতে পারি না। তাই এই পেশাকেই আঁকড়ে ধরে আছি। মাঝিরা যদি আগে থেকেই নৌকার চাহিদা জানাতেন, তাহলে পরিকল্পনা করে আরও ভালোভাবে কাজ করা যেত।”

স্থানীয়দের মতে, চলনবিলের নৌকা শুধু একটি পরিবহন নয়, এটি বিলাঞ্চলের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্ষার চার মাস এই নৌকাই হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং জীবিকার প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠে। তাই বর্ষা এলেই চলনবিলজুড়ে আবারও প্রাণ ফিরে পায় শত বছরের ঐতিহ্যবাহী নৌকা নির্মাণশিল্প।


এ সম্পর্কিত আরো খবর