ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) ডেঙ্গু মশক নিধন কার্যক্রমে সিঙ্গাপুরের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের নাম ভাঙিয়ে নকল ও জালিয়াতি করা কীটনাশক সরবরাহের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মশা মারার জন্য ৫ হাজার কেজি ব্যাসিলাস থুরিনজিয়েনসিস ভ্যার. ইসরায়েলেনসিস (বিটিআই) নামক জৈব কীটনাশক ক্রয়ের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছিল নগর কর্তৃপক্ষ। নিয়ম অনুযায়ী শর্ত ছিল, সরবরাহকৃত এই কীটনাশক অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া অথবা ভারতের যেকোনো একটি দেশে উৎপাদিত হতে হবে।
এই সরকারি দরপত্রে অংশ নিয়ে কাজ বাগিয়ে নেয় দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মার্শাল এগ্রোভেট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি ১ কোটি ৬৯ লাখ ২৬ হাজার ৫ টাকার বিনিময়ে এই কীটনাশক সরবরাহের কার্যাদেশ পায় এবং নিয়মানুযায়ী ১৬ লাখ ৯২ হাজার টাকা পারফরম্যান্স সিকিউরিটি বা জামানত জমা দেয়। ২০২৩ সালের ১ আগস্ট মার্শাল এগ্রোভেট ডিএনসিসির ক্রয় ভাণ্ডারে কীটনাশক সরবরাহ করে দাবি করে যে, এগুলো সিঙ্গাপুরের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান 'বেস্ট কেমিক্যাল কোম্পানি (এস) প্রাইভেট লিমিটেড' থেকে আমদানি করা হয়েছে। পণ্যটির মোড়কেও সিঙ্গাপুরের ওই কোম্পানির নাম ও লোগো ব্যবহার করা হয়েছিল।
সরবরাহকৃত এই কীটনাশক শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে প্রাথমিক ল্যাব টেস্টের পর ২০২৩ সালের ৩ আগস্ট এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগের উদ্বোধন করা হয়। তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের উপস্থিতিতে এই পাইলট প্রকল্পের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছিল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আসামিরা লি কিউইয়াং নামের এক বিদেশী নাগরিককে সিঙ্গাপুরের মূল কোম্পানির দায়িত্বশীল প্রতিনিধি হিসেবে হাজির করেন। গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার হওয়া ওই অনুষ্ঠানে এই চীনা নাগরিক মশক নিধন কর্মীদের কীটনাশকের ব্যবহারবিধি ও মাঠপর্যায়ের প্রয়োগের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণও প্রদান করেন।
তবে এই জালিয়াতির স্থায়িত্ব বেশিদিন টেকেনি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের খবর ও ছবি গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা সিঙ্গাপুরের মূল বেস্ট কেমিক্যাল কোম্পানির নজরে আসে। এরপরই ঘটে মূল বিস্ফোরণ। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট সিঙ্গাপুরের বেস্ট কেমিক্যাল কোম্পানি তাদের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে পরিষ্কার জানিয়ে দেয় যে, তারা বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানকে এই ধরণের কোনো কীটনাশক সরবরাহ বা বিক্রি করেনি। বিষয়টি সিটি কর্পোরেশনের নজরে আসার পর তারা সিঙ্গাপুরের ওই কোম্পানির সাথে সরাসরি যোগাযোগ করলে গত ১৭ আগস্ট তারা লিখিতভাবেও বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায় যে মার্শাল এগ্রোভেটের দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।
সিঙ্গাপুরের কোম্পানির কাছ থেকে এমন তথ্য পাওয়ার পর ২০২৩ সালের ২১ আগস্ট ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সহকারী ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মো. রাহাত আল ফয়সাল বাদী হয়ে গুলশান থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় মার্শাল এগ্রোভেটের তিন শীর্ষ কর্মকর্তা এবং ভুয়া প্রতিনিধি সাজা চীনা নাগরিক লি কিউইয়াংকে আসামি করা হয়। মামলার পর ২৪ আগস্ট উচ্চ আদালত থেকে ছয় সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান আসামিরা। জামিনের মেয়াদ শেষ হলে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ৫ অক্টোবর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে আত্মসমর্পণ করে পুনরায় জামিনের আবেদন করেন তারা। সেদিন আদালত তাদের আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপর ৯ অক্টোবর রিমান্ড ও জামিন উভয় আবেদনই নাকচ করেন আদালত। অবশেষে দীর্ঘ ১০ দিন হাজতবাসের পর ১৬ অক্টোবর মাত্র ৫ হাজার টাকা মুচলেকায় আদালত থেকে জামিন পান আসামিরা এবং বর্তমানে তারা জামিনেই মুক্ত রয়েছেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী সেলিনা বেগম (ইউনা) জানান, তিনি আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন, তবে ডিবির দাখিল করা সাম্প্রতিক চার্জশিটটি তিনি এখনও দেখেননি।
এই ঘটনার দীর্ঘ প্রায় তিন বছর পর সম্প্রতি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. জেহাদ হোসেন আদালতে এই মামলার চূড়ান্ত চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। চার্জশিটে মার্শাল এগ্রোভেটের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলাউদ্দিন এবং নির্বাহী পরিচালক নাসির উদ্দিন আহমেদকে জালিয়াতি ও প্রতারণার দায়ে সরাসরি অভিযুক্ত করা হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, আসামিরা কোনো একটি অজ্ঞাত উৎস থেকে মানহীন রাসায়নিক বা কীটনাশক সংগ্রহ করে সিঙ্গাপুরের কোম্পানির নকল মোড়কে ভরে ডিএনসিসিতে সরবরাহ করেছিলেন, যা জালিয়াতি ও প্রতারণামূলক বিশ্বাসভঙ্গের শামিল। তবে প্রকৃত নাম ও সঠিক ঠিকানা যাচাই-বাছাই করতে না পারার কারণে ভুয়া প্রতিনিধি সাজা চীনা নাগরিক লি কিউইয়াংকে এই মামলার দায় থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। মো. জেহাদ হোসেন জানান, ২০২৫ সালের আগস্টে তিনি এই মামলার তদন্তভার গ্রহণ করেন। তার আগে আরও দুজন কর্মকর্তা এটি তদন্ত করেছিলেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সাক্ষী ও বাদীর জবানবন্দি গ্রহণের পর আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত জালিয়াতির অভিযোগ প্রাথমিকভাবে শতভাগ প্রমাণিত হওয়ায় এই চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে।