ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে যখন স্পেন ও ফ্রান্সের হাইভোল্টেজ সেমিফাইনাল দেখার অপেক্ষায় বুঁদ ক্রীড়াবিশ্ব, ঠিক তখনই মাঠের বাইরের এক রাজনৈতিক মন্তব্যকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফ্রান্স ফুটবল দলকে নিয়ে বর্ণবাদী ও উস্কানিমূলক মন্তব্য করে এবার নিজ দেশ ও ফ্রান্সে তুমুল তোপের মুখে পড়েছেন স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাজয়। ফরাসি জাতীয় দলে ‘কোনো প্রকৃত ফরাসি ফুটবলার নেই’—তাঁর এমন অবমাননাকর মন্তব্য ফুটবল বিশ্বকাপের ক্রীড়াসুলভ পরিবেশকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করেছে, যা দুই দেশের রাজনৈতিক মহলেও ঝড় তুলেছে।
রোববার স্প্যানিশ অনলাইন সংবাদমাধ্যম এল ডিবেট-এ মারিয়ানো রাজয়ের এই বিতর্কিত বক্তব্যটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় সমালোচনার ঝড়। স্পেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘জেনোফোবিক’ বা ‘বিদেশি বিদ্বেষী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এই সমাজতান্ত্রিক নেতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, সমাজে এখনো এমন কিছু মানুষ আছেন যারা একজন মানুষের পদবি, জন্মস্থান বা গায়ের রঙ দেখে তাঁর নাগরিকত্ব পরিমাপ করার চেষ্টা করেন। অথচ একটি দেশের প্রতি টান এবং দেশের জন্য অবদান রাখার ইচ্ছার ওপর ভিত্তি করেই নাগরিকত্ব পরিমাপ করা উচিত। তিনি আরও যোগ করেন, স্পেন আসলে তাদেরই যারা এই দেশকে ভালোবাসে এবং এর জন্য কাজ করে; তাদের নয়, যারা এমন বিদেশি-বিদ্বেষী মন্তব্য করে দেশের আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষুণ্ন করে। শুধু প্রধানমন্ত্রীই নন, স্পেনের পরিবহন মন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তেও ক্ষোভ উগরে দিয়ে রাজয়কে ‘ফ্রাঙ্কো পরবর্তী নির্বোধ’ বলে কটাক্ষ করেছেন।
অন্য দিকে, স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এই আপত্তিকর মন্তব্যের পর চুপ করে থাকেনি ফ্রান্সের রাজনৈতিক মহলও। ফরাসি রাজনীতিকরা একযোগে এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ত নুনেজ ফরাসি টেলিভিশন চ্যানেল বিএফএমটিভি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, এই ধরনের মন্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতা ফ্যাবিয়েন রওসেল এই ঘটনার নিন্দা জানাতে গিয়ে প্যারাগুয়ের সিনেটর সেলেস্তে আমারিল্লার একটি পূর্ববর্তী বর্ণবাদী মন্তব্যের উদাহরণ টানেন। শেষ ষোলোর ম্যাচে ফ্রান্সের কাছে হেরে প্যারাগুয়ে বিদায় নেওয়ার পর আমারিল্লা বলেছিলেন, ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে একজন ‘উপনিবেশিত ক্যামেরুনীয়, যিনি ফরাসি হওয়ার ভান করছেন’। রওসেল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই নেতারা আসলে সমাজ থেকে জঘন্য বর্ণবাদ ছড়ানো বন্ধ করতে পারছেন না।
এই ঘটনার পর ফ্রান্সের বৈষম্যবিরোধী মন্ত্রী অরোরে বার্গও বিশ্বমঞ্চে বারবার এমন বর্ণবাদী আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এখন সময় এসেছে এসব নোংরামি বন্ধ করার এবং খেলাকে শুধু খেলার জায়গায় ফিরিয়ে আনার। খেলার মাঠ এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে কেবল প্রতিভা দিয়ে মানুষকে বিচার করা উচিত, অন্য কোনো বৈষম্যমূলক মাপকাঠিতে নয়। ফরাসি সমাজতান্ত্রিক নেতা অলিভিয়ের ফাউরে এক্স-এ এক পোস্টে মনে করিয়ে দেন যে, ফ্রান্সের দলের ‘কোনো নির্দিষ্ট গায়ের রঙ বা ধর্ম নেই’।
এমনকি মাদ্রিদে অবস্থিত ফ্রান্সের দূতাবাসও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কড়া জবাব দিয়ে লিখেছে, ফরাসি দলের ২৬ জন ফুটবলারের মধ্যে ২৩ জনই ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং বাকি ৩ জন বিদেশে জন্মালেও তারা সবাই ফরাসি নাগরিক। ফরাসি ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ফিলিপ্পে দিয়ালো পুরো বিষয়টি নিয়ে বলেন, স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যটি ছিল মূলত এক অসহনীয় বর্ণবাদের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত। ব্লকবাস্টার সেমিফাইনালের আগে মাঠের বাইরের এই রাজনৈতিক উত্তাপ মাঠের লড়াইয়ে কেমন প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।