জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব এবার দৃশ্যমান হলো উন্নত মহাদেশ ইউরোপে। গত জুন মাসের শেষ ভাগে মাত্র আট দিন ধরে চলা নজিরবিহীন এক তাপপ্রবাহে মহাদেশটিতে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। ইউরোপভিত্তিক অন্যতম প্রধান জরিপ সংস্থা ইউরোমোমো গতকাল রোববার তাদের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক তথ্য নিশ্চিত করেছে। বছরের এই সময়ে এত অল্প সময়ের মধ্যে কেবল প্রচণ্ড গরমের কারণে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর ঘটনাকে চরম অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২৭টি সদস্য রাষ্ট্র এবং জাতিসংঘের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিষয়ক অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) যৌথ নির্দেশনায় পরিচালিত হয় জরিপ সংস্থা ইউরোমোমো। সংস্থাটির রোববারের প্রকাশনা থেকে জানা গেছে, গত ২০ জুন থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত আট দিনের সেই তীব্র তাপপ্রবাহের সরাসরি শিকার হয়েছেন ইউরোপের নাগরিকরা। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, মৃতদের মধ্যে প্রায় ৯ হাজার মানুষের বয়স ছিল ৬৫ বছর বা তার চেয়ে বেশি। অর্থাৎ বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকরাই এই অতিপ্রবল গরমের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়েছেন।
ইউরোমোমার শীর্ষ কর্মকর্তা এবং ডেনমার্কের স্ট্যাটেন্স সেরাম ইনস্টিটিউটের প্রধান চিকিৎসক লাসে ভেস্টারগার্ড আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে এই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, মারা যাওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশই মূলত ‘হিট-স্ট্রোক’ অথবা অতিরিক্ত গরমের কারণে সৃষ্ট হৃদযন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। এর পেছনে তীব্র তাপপ্রবাহ ছাড়া অন্য কোনো কারণ নেই। বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে এত কম দিনের ব্যবধানে এত প্রাণহানি সত্যিই অবিশ্বাস্য এবং অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
ইউরোমোমোর এই প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট করে ইইউভুক্ত কোন দেশে কতজন মারা গেছেন তা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে তারা স্পষ্ট করেছে যে, মোট মৃত্যুর একটি বিশাল অংশই ঘটেছে ফ্রান্স এবং বেলজিয়ামে। সরকারি বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রে গরম ও তাপপ্রবাহের কারণে বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৫০০ জন মানুষ মারা যাচ্ছেন এবং গত দুই মাস অর্থাৎ আট সপ্তাহ ধরে সেখানে এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বজায় রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ বিষয়ক প্রধান অঙ্গসংস্থা ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল (ইসিডিপিসি)-এর নথিপত্র অনুযায়ী, এর আগে ইউরোপে এক সপ্তাহে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছিল ২০২০ সালের মে-জুন মাসে করোনা মহামারির চরম ক্রান্তিকালে। সেই সময় ভাইরাসটির থাবায় এক সপ্তাহে ১ হাজার ৬৫০ জনের বেশি মানুষ মারা যান। কিন্তু বর্তমানের এই তাপপ্রবাহ যেন সেই মহামারির স্মৃতিকেও মনে করিয়ে দিচ্ছে।
ইউরোপের জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, জুনের এই প্রলয়ঙ্কারী তাপপ্রবাহ প্রাকৃতিক নয়, বরং মানুষের তৈরি পরিবেশ দূষণ ও তীব্র জলবায়ু পরিবর্তনের ফল। তাঁরা সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সামনের বছরগুলোতে এই ধরনের প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ বারবার ফিরে আসবে, যা মানবসভ্যতার জন্য আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।