সপ্তাহজুড়ে আকাশভাঙা অবিরাম বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা আর পাহাড়ি ঢলের তোড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা। বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার সড়ক যোগাযোগ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চরম এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখেও দুর্গত ও পানিবন্দী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দিনরাত নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা প্রশাসন। প্রশাসনের এমন দ্রুত ও মানবিক তৎপরতা দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বস্তি ও সাহস জুগিয়েছে।
সাম্প্রতিক এই অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতের কারণে নাইক্ষ্যংছড়ি-রামু সড়কের জারুলিয়াছড়ি আদর্শগ্রাম বিজিবি চেকপোস্ট সংলগ্ন বেইলি ব্রিজটি হুড়মুড়িয়ে ধসে পড়ে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই রুটে সব ধরনের যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে আদর্শগ্রাম বিজিবি চেকপোস্টের আশপাশের সড়ক বুক থেকে গলা সমান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে পুরো এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, যা স্থানীয়দের চরম দুর্ভোগে ফেলে।
এমন ভয়ংকর ও বৈরী পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে দুর্গতদের পাশে ছুটে গেছেন নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. এনামুল হাসান। তিনি প্রবল বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতাকে উপেক্ষা করে একটি সাধারণ ভ্যানে চড়ে গলা সমান পানি পাড়ি দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বেইলি ব্রিজের মূল ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সেখানে পৌঁছে তিনি যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলমান ব্রিজের মেরামত কাজ এবং জারুলিয়াছড়ি খালের ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য অংশ ও বিদ্যুৎ বিভাগের উপড়ে যাওয়া খুঁটি দ্রুত সংস্কারের কাজ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
টানা বর্ষণের কারণে নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নের ধুংরী হেডম্যানপাড়া, নাইক্ষ্যংছড়ি বাজার, আদর্শগ্রাম সড়ক, আশারতলী, কম্বুনিয়া ও জারুলিয়াছড়ির নিচু এলাকাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বন্যার খবর পাওয়ার পরপরই উপজেলা প্রশাসনের বিশেষ দল দ্রুত আশারতলী, কম্বুনিয়া ও বিছামারা এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত ও পানিবন্দী শত শত পরিবারের মাঝে খাদ্য ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানোর কাজ শুরু করে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. এনামুল হাসান এই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বলেন, সকালে নাইক্ষ্যংছড়ি-রামু সড়কের জারুলিয়াছড়ি এলাকায় ধসে যাওয়া বেইলি ব্রিজের জরুরি মেরামত কাজ আমরা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো যত দ্রুত সম্ভব এই সড়কটিকে পুনরায় সচল করে জনজীবন স্বাভাবিক করা। দুপুরের পর থেকে আমরা সদর ইউনিয়নের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দোরগোড়ায় গিয়ে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছি। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসনের এই মানবিক ও জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। সরকারের পক্ষ থেকে দুর্গতদের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দারা জানান, পাহাড়ি ঢলে ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় তাদের রান্নাবান্না ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছিল। তবে উপজেলা প্রশাসনের এমন তাৎক্ষণিক তৎপরতা, উদ্ধার অভিযান এবং খাদ্য সহায়তা পাওয়ার পর মানুষের মনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, পুরো উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধারসহ জরুরি অবকাঠামো মেরামতের কাজ সমানতালে চলছে।