ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলে ইংলিশ দলগুলোর জন্য লিওনেল মেসি মানেই এক মূর্তিমান আতঙ্ক। গত দেড় দশকে ইংলিশ ক্লাবগুলোর বিপক্ষে ৩৫ ম্যাচে তিনি একাই করেছেন ২৭টি গোল। এর মধ্যে ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগে আর্সেনালের বিপক্ষে চার গোল করার সেই অবিশ্বাস্য অতিমানবীয় পারফরম্যান্স এখনো ফুটবলপ্রেমীদের চোখে লেগে আছে। ম্যাচ শেষে আর্সেনালের তৎকালীন ম্যানেজার আর্সেন ওয়েঙ্গার মেসিকে তুলনা করেছিলেন ভিডিও গেমের ‘প্লে স্টেশন’ চরিত্রের সঙ্গে। ক্লাব ফুটবলে ইংলিশদের এমন রক্তক্ষরণ ঘটানো মেসি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসে এই প্রথমবার বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবল বিশ্ব শাসন করা এই মহাতারকা কেন তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে কখনো থ্রি-লায়ন্সদের মুখোমুখি হতে পারেননি, তা নিয়ে ক্রীড়ামোদীদের আগ্রহের কমতি নেই।
অভিষেকের লাল কার্ড ও জেনেভার সেই আক্ষেপ
লিওনেল মেসি ও ইংল্যান্ডের মুখোমুখি না হওয়ার পেছনে রয়েছে কিছু কাকতালীয় ও কৌশলগত কারণ। ২০০৫ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যে সর্বশেষ একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই ম্যাচে ১৮ বছর বয়সী তরুণ মেসি দলে ছিলেন না কেবল একটি নিষেধাজ্ঞার কারণে। তার ঠিক তিন মাস আগে আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল মেসির। কিন্তু মাঠে নামার মাত্র ৪৭ সেকেন্ডের মাথায় প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারকে কনুই দিয়ে আঘাত করার অপরাধে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। ফলে জেনেভার সেই হাইভোল্টেজ ম্যাচে মেসির আর খেলা হয়নি, যেখানে ইংল্যান্ড ৩-২ ব্যবধানে জয়লাভ করে।
উয়েফা নেশনস লিগ ও এএফএর বাণিজ্যিক চাল
বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের লড়াই মানেই বাড়তি উত্তেজনা। ১৯৬৬, ১৯৮৬, ১৯৯৮ এবং সর্বশেষ ২০০২ সালের বিশ্বকাপে দল দুটি একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিল। ২০০২ বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহামের পেনাল্টি গোলে ইংল্যান্ড জেতার পর দীর্ঘ ২৪ বছর দুই পরাশক্তি আর কখনো মুখোমুখি হয়নি। ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এফএ) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ফুটবল সূচির আধুনিক পরিবর্তন এবং ইউরোপে ‘উয়েফা নেশনস লিগ’ চালু হওয়ার পর থেকে ইউরোপের দলগুলোর সূচি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা সাধারণত ল্যাটিন আমেরিকার দলগুলোর সঙ্গে খেলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এছাড়া প্রীতি ম্যাচের ক্ষেত্রে তারা মধ্যপ্রাচ্য কিংবা উত্তর আমেরিকার মতো অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক অঞ্চলের ওপরই বেশি জোর দেয়।
আকাশচুম্বী ম্যাচ ফি ও চুক্তিভঙ্গের বিতর্ক
২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) বাণিজ্যিকভাবে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ও লাভজনক ফেডারেশনে পরিণত হয়েছে। স্পনসরশিপ থেকেই তাদের বার্ষিক আয় এখন প্রায় ৮ কোটি ডলার (যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯৮৯ কোটি টাকা)। বর্তমানে একেকটি প্রীতি ম্যাচের জন্য তারা ফি দাবি করে ৩০ থেকে ৪০ লাখ ডলার। চুক্তিতে মেসির নাম সরাসরি না থাকলেও, মূলত তাকে মাঠে দেখার জন্যই আয়োজকরা এই বিশাল অংকের অর্থ দিতে রাজি হয়। সম্প্রতি মায়ামির একটি আদালতে এএফএর বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গের মামলাও হয়েছে, যেখানে অভিযোগ করা হয় ইন্টার মায়ামির ম্যাচের জন্য মেসিকে ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে খেলানো হয়নি, যা চুক্তির পরিপন্থী ছিল।
এফবিআইয়ের তদন্তের ছায়া
মেসি ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার দীর্ঘ বিরতির সঙ্গে এর সরাসরি সংযোগ না থাকলেও, সম্প্রতি এএফএর কিছু অন্ধকার দিক সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই সম্ভাব্য অর্থ পাচার ও জালিয়াতির অভিযোগে আর্জেন্টিনার ফুটবল ফেডারেশনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। আর্জেন্টিনার শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র লা নাসিওনের বরাত দিয়ে মায়ামি হেরাল্ড জানিয়েছে, ফ্লোরিডার কিছু ব্যাংকের মাধ্যমে এএফএ প্রায় ৩০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ অবৈধভাবে লেনদেন করেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ফেডারেশনের প্রধান ক্লদিও তাপিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগ তদন্তাধীন থাকলেও এএফএর মুখপাত্র জানিয়েছেন, তদন্ত শুরু হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়।
আটলান্টায় মহাকাব্যিক লড়াইয়ের অপেক্ষা
আগামী বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ৩৯ বছর বয়সে পদার্পণ করা মেসি এই বিশ্বকাপেও দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন, যেখানে তিনি ইতিমধ্যে ৮টি গোল ও ২টি অ্যাসিস্ট করেছেন। যদিও ল্যাটিন পরাশক্তিদের রক্ষণভাগ কিছুটা নড়বড়ে, তবুও ইংলিশ শিবির আর্জেন্টিনাকে বিদায় করার ছক কষছে। এই ঐতিহাসিক ম্যাচটিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্য ও আমেরিকার ফুটবল ভক্তদের মধ্যে টিকিটের হাহাকার শুরু হয়েছে এবং ফিফার টিকিট বিক্রির অ্যাপগুলোতে টিকিটের দাম এখন আকাশচুম্বী। বিশ্ব ফুটবল এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে মেসির ক্যারিয়ারের প্রথম ‘ইংল্যান্ড বধ’ দেখার জন্য।